শৈলেন বহুদিন বাদে মাসির বাড়ি যাচ্ছে. ট্রেন টা খালি হয়ে এসেছে, দুই এক জন প্যাসেঞ্জার, বাকিরা সবাই আগের স্টেশন গুলোতে নেমে গেছে, এই একটা মাত্রই ট্রেন এই স্টেশন অবধি আসে , নিঝুম গড়. রাত দশটা ট্রেন ঢোকবার সময়, এখন প্রায় পৌনে এগারোটা, যাক এসে তো পৌছালো. মাসির শরীরটা ভালো নেই, পোষ্ট অফিস থেকে দুদিন আগে ফোন করেছিলো, মাসিকে নিয়ে যেতে আসতেই হোলো, মাসি একা মানুষ দেখা শোনার লোক নেই, আগে ছোটবেলায় এসেছে, শেষ আসে পাঁচ বছর আগে, রাতে এরকম আসেনি . এইবার এতো রাতে আসতে হোলো, কাজ মিটিয়ে বেরোতে একটু দেরি হয়ে গেছে, ফলে রাতের ট্রেনই ধরতে হোলো.
ষ্টেশনে নেমে আসে পাশে কাউকে দেখতে পায়না কোনো ভ্যান রিক্সা চোখে পড়ছে না, এতো রাতে কোনো রিক্সা পাওয়ার আসা না করাই ভালো. এই ভেবে হেঁটেই এগোতে লাগলো শৈলেন. প্রায় অনেকটাই পথ, মেঠো পথের ধার দিয়ে এগোতে থাকে, গ্রাম গঞ্জের ব্যাপার ইলেক্ট্রিসিটি থাকলেও বেশিরভাগ সময় লোডশেডিং থাকে. অন্ধকার গুটগুট করছে, দূরে জঙ্গলে জোনাকির আলো ঝিঁঝি পোকার ডাক, বহুদিনের পরিচিত রাস্তাকেও অপরিচিত করে তুলছে. দূরে একটা ভ্যান রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে, শৈলেন অন্ধকার ভেঙে একটু এগিয়ে এসে ই দেখতে পেলো হ্যাঁ ভ্যান রিক্সা ই তো, তবে কাউকে আসে পাশে দেখতে পাচ্ছে না.
____ কেউ আছেন?? কেউ আছেন নাকি???
_____ কে...
বিদঘুটে গলায় "কে" বলে লোকটা এদিকেই তো এগিয়ে আসছে...
______ যাবেন নাকি??? পোস্ট অফিসের ধারে রমাবানিজ্যের বাড়ি যাবো. শৈলেন বলে ওঠে. মেসো মশাইয়ের এককালে খুব নাম ছিলো, এদিকে ব্রাহ্মণ তারওপর জমিদার.
_____ কে শৈলেন খোকা???
ভ্যানের সামনে একটা থলে মতন কিছু ঝোলানো, তার ভেতর থেকে একটা দেশলাই আর একটা কূপি বার করে জ্বালায়.
অন্ধকারে একটু আলোর দেখা পেয়ে শৈলেন ও যেন একটু নিশ্চিন্ত হয়.
_____ হ্যাঁ আমি, কিন্তু আপনি চিনলেন কি করে?
_____ তুমি তো আগে প্রায় ই এইখানে আসতে
______ সেওতো প্রায় পাঁচ সাত বছর আগে
______ দেখো তো খোকা চিনতে পারো কিনা, কূপি টা মুখের সামনে তুলে ধরে
কাঁচা পাকা দাড়ি, গলায় গামছা, নোংরা মুখে ফোকলা হাসি, স্মৃতির ডাল পালা হাতরে মনে পড়ে, অজয় খুঁড়ো না ! আগে প্রায় ই মাসির বাড়ি আসলে ষ্টেশন থেকে ভ্যানে করে নিয়ে যেতো, আবার ফেরবার সময় ষ্টেশনে পৌঁছে দিত .
______অজয় খুঁড়ো তুমি -
______ চিনতে পেরেছো তাহলে - বসো আর দেরি করেনা, রানীমা অপেক্ষা করছে.
গ্রামের সবাই মেসো কে রাজাবাবু আর মাসি কে রানীমা বলেই ডাকতো, বাইরের পৃথিবী পাল্টে গেলেও গ্রামটা আগের মতোই আছে.
ষ্টেশনে বারোটার ঘন্টা পড়তে শোনা গেলো.
___ বসো শৈলেন খোকা
শৈলেন ভ্যানে উঠে বসে, অজয় খুঁড়ো ভ্যান টানতে শুরু করে, কিছুটা মাঠের ভেতর দিয়ে তবে গ্রামের পথ, আধ ক্রোশ পথ হবে. কুপির আলোটা হাওয়ায় কাঁপছে. অজয় খুঁড়োর পা ভ্যানের চাকায় উঠছে আর নামছে নিস্তব্ধতা কে কাটাতে শৈলেন জিজ্ঞেস করে
_____ তোমার বাড়িতে কে কে আছে গো খুঁড়ো
_____ তোমার খুড়ীমা অনেকদিন হোলো গত হয়েছেন আমার এক মেয়ে কে রানীমা আশ্রয় দিয়েছেন, ওর মা চলে যাবার পর থেকে , সেও ----
কথা শেষ না হতেই ভ্যানের চাকার তলায় বুঝি কোনো কুকুরের বাচ্চা এসে গিয়েছিলো কিঁউ মিউ শব্দে সরে গেলো.
___ আর কতো দূর খুঁড়ো
___ এই তো এসে গেছি
শৈলেন তাকিয়ে দেখে হ্যাঁ মাসির বাড়ির বাইরে বড়ো গেট, গেটের সামনে ভ্যান এসে দাঁড়িয়েছে. শৈলেন নেমে অজয় খুঁড়ো কে পকেট থেকে টাকা বার করে দিতে যায়,
খুঁড়ো ফোকলা হাসি দিয়ে
____ লাগবে না, রানীমা দে দেছেন.
বলেই ভ্যান নিয়ে চলে যেতে লাগে.
____ শোনো খুঁড়ো কাল সকালে স্টেশন যাবো..
খুঁড়ো উত্তর দেয়না. অন্ধকারে হারিয়ে যায়. কুপির আলোটাও মিলিয়ে যায়. লোডশেডিং তাই বলে মাসি একটাও আলো জ্বালাবেনা এ কেমন কথা? অন্ধকারের ও একটা আলো থাকে, সেই আলোতেই গেট খুলে ভেতরে ঢোকে শৈলেন.
___ মাসি ও মাসি আমি শৈলেন
আরো একটু এগিয়ে যায়, পাঁচ বছর আগে শেষ যখন এসেছিলো, কত জমজমাট থাকতো, মেসো তখন ও বেঁচে, বছর দুয়েক হোলো মেসো মারা গেছে. গ্রামটার কোনো উন্নতি হয়নি মাসির কাছে ফোনে খবর পেতো. কতবার মাসিকে বলেছে গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে শহরে চলে আসবার জন্য. মাসির নিজের কোনো সন্তান নেই, ফোন বলতে সেই পোস্ট অফিসের ফোন. মাঝে মাঝে ফোনে বলেছে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে যাবেনা, মাসির কাছে শুনেছিলো একবার খুঁড়োর মেয়ের কথা. প্রায় মাস তিনেক আগে বৃষ্টির সময় মাসি একবার ফোন করেছিলো বৃষ্টির সময়, বন্যার আশঙ্কা ছিলো, সবাই গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলো, মাসি বলেছিলো গ্রাম ছেড়ে সে যাবে না, কতবার শৈলেনের মা বাবাও বলেছে শোনেনি.
____ আপনি শৈলেন দা
পাশের থেকে এক মেয়ের গলা পেয়ে ঘুরতেই
_____ মাসি বলছিলো আপনার আসবার সময় হয়ে গেছে. আসুন এইদিকে আস্তে ভাঙা চোরা সিঁড়ি, বন্যার সময় জল ঢুকে নিচের তলার সবটাই নষ্ট হয়ে গেছে.
শৈলেন মনে মনে ভাবছে এই বুঝি সেই খুঁড়োর মেয়ে,
_____ আমি মালা-
_____অজয় খুঁড়োর মেয়ে??
_____ হ্যাঁ
লণ্ঠনের আলোয় মেয়েটার মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না এতো অন্ধকার চারিপাশে.
____ আলো আসবেনা. একবার গেলে দুই তিন দিনের মধ্যে দেখা নেই.
শৈলেন একটু অবাক হয়, মেয়েটাকি মন পরতে পারে, যে কথাই ভাবছে, তার ই উত্তর দিয়ে দিচ্ছে.
_____ মাসি মাসি, শৈলেন দাদাবাবু এসেছে -
ওপর তলায় মাসির ঘর ছিলো, এঘর শৈলেনের চেনা, ছোটবেলায় কত এসেছে
_____ শৈলেন এসেছিস বাবা
_____ মাসির গলার আওয়াজে দক্ষিণের বারান্দার দিকে তাকায়, মাসির ঘরের লাগোয়া এই বারান্দা, আগেও মাসি অবসর সময়ে বারান্দায় বসে থাকতো.
অন্ধকারে মাসির মুখটাও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেনা. তবু গলার স্বর, শাড়ি পড়বার ধরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে এই তার সোনা মাসি. এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতে যায়, মাসি বাঁধা দিয়ে বলে, মেলা রাত হয়েছে, হাত মুখ ধুয়ে এসে খাবার খেয়ে নে. সেই কখন বেরিয়েছিস. তারপর তোকে একটা জিনিস দেবো.
____ কি জিনিস
____ এ বাড়ির দলিল, পুরোনো গয়না, একশো বছরের পুরোনো, এ পরিবারের সাত কূলে কেউ তো নেই তাই সব তোকেই দিয়ে যাবো, আমি আর কতদিন আগলে রাখবো বল -
____ সে কাল দেখা যাবে. তোমাকে আমি এবার নিয়েই তবে যাবো.
হাত মুখ ধুয়ে এসে খেতে বসে শৈলেন, মাসি আজ ও মনে রেখেছে তার পছন্দের সব খাবার. খেয়েদেয়ে এবার একটু শুয়ে ঘুমিয়ে নেবে ভাবছে, অজয় কাকা কে না বললেই হতো ভোরের ট্রেন ধরবে, আসলে জানিয়ে দেবে, যাবেনা. একদিন থেকে তারপর ফিরবে.
_____ কিরে শুয়ে পড়েছিস
মাসির ঘরেই গা এলিয়ে দিয়েছে, এই ঘরেই একটু আলো, এতো বড়ো জমিদার বাড়ি, অন্ধকারে ভুতুড়ে বাড়ি লাগছে.
____ হ্যাঁ মাসি কোথায় শোয়ার ব্যবস্থা করেছো আমার, অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হচ্ছে না
_____ এখন শুয়ে কি করবি, তোর জিনিস গুলো আগে সামলা, -
_____ কাল দেখবো
______ না এখন ই
অগত্যা, ইচ্ছা না থাকলেও সায় দিতে হোলো কোই দেখাও
____ তোর ব্যাগে এগুলো ঢুকিয়ে নে-
অন্ধকারে তেমন কিছু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না, মনে হোলো দলিল জাতীয় কাগজ পত্র, আর একটা পুরোনো গয়নার বাক্স. ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয় শৈলেন,
____ এগুলো কাল দিলে হতো না, আর তুমি এবার আমার সাথে যাবে.
কথাটা বলে আদরে জড়িয়ে ধরতে গিয়েই কেমন হাত পা ঠান্ডা হয়ে ঝট করে সরে এসে পাশে রাখা হেরিকেন টা সামনে নিয়ে এসে ধরলো ভয়ে আঁতকে উঠলো শৈলেন, এ কি দেখছে কঙ্কালের গায়ে শাড়ি পেঁচানো, ভয়ে হাত থেকে হেরিকেন টা পড়ে এদিক ওদিক তেল ছিটকে আগুন জ্বলছে, কঙ্কাল চেহারা র নির্লিপ্ত চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে,
____বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে, আমি প্রাণে বেঁচে ছিলাম, কিন্তু জল নামার সাথে সাথে রোগে ধরলো পুরো গ্রাম শেষ হয়ে গেলো, বাড়িটার ওপর নজর আছে পাশের গ্রামের পঞ্চায়েতের তাই সব তোর নামে করেই রেখেছিলাম দিয়ে গেলাম. আমিও বেঁচে নেই রে বাবু.
শোনা মাত্রই দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো শৈলেন
___ আস্তে ভাঙা আছে
অজয় খুঁড়োর মেয়ের কথায় ঘুরে দাঁড়ায় শৈলেন কাছে এগিয়ে জিজ্ঞেস করে
____ আমার মাসি
আর কিছু বলতে পারেনা
_____ আমার হাত টা ধরো দাদাবাবু অন্ধকারে পড়ে যাবে
কেমন যেন ঘোরের মধ্যেই হাত টা ধরে, বরফের মতো ঠান্ডা, এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে ছুটতে ছুটতে নেমে এসে গেট দিয়ে বেরিয়ে আসে, অজয় খুঁড়ো ভ্যান রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে ই আছে
____ খুঁড়ো স্টেশন চলো
খুঁড়ো ও ছুটতে থাকে রিক্সা নিয়ে. সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে অন্ধকার মাঠ ঘাট পেরিয়ে খুঁড়োর রিক্সা স্টেশনের মুখে এসে দাঁড়ায় শৈলেন নেমে স্টেশনের দিকে এগোতে থাকে,
___ খোকা বাবু
___ খুঁড়োর ডাকে শৈলেন ফিরে তাকায়
মনে ভাবে খুঁড়ো কে টাকা দেবে কি করে সব কিছু তো মাসির বাড়িতেই ফেলে এসেছে.
____ তোমার ব্যাগ
ভ্যান থেকে শৈলেনের ব্যাগ টা নামিয়ে দেয়
শৈলেন ভাবে ব্যাগ টা তো সে ফেলে এসেছিলো. শৈলেন কিছু বলতে পারেনা. মাথা ঘুরছে.
ষ্টেশনে নেমে আসে পাশে কাউকে দেখতে পায়না কোনো ভ্যান রিক্সা চোখে পড়ছে না, এতো রাতে কোনো রিক্সা পাওয়ার আসা না করাই ভালো. এই ভেবে হেঁটেই এগোতে লাগলো শৈলেন. প্রায় অনেকটাই পথ, মেঠো পথের ধার দিয়ে এগোতে থাকে, গ্রাম গঞ্জের ব্যাপার ইলেক্ট্রিসিটি থাকলেও বেশিরভাগ সময় লোডশেডিং থাকে. অন্ধকার গুটগুট করছে, দূরে জঙ্গলে জোনাকির আলো ঝিঁঝি পোকার ডাক, বহুদিনের পরিচিত রাস্তাকেও অপরিচিত করে তুলছে. দূরে একটা ভ্যান রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে, শৈলেন অন্ধকার ভেঙে একটু এগিয়ে এসে ই দেখতে পেলো হ্যাঁ ভ্যান রিক্সা ই তো, তবে কাউকে আসে পাশে দেখতে পাচ্ছে না.
____ কেউ আছেন?? কেউ আছেন নাকি???
_____ কে...
বিদঘুটে গলায় "কে" বলে লোকটা এদিকেই তো এগিয়ে আসছে...
______ যাবেন নাকি??? পোস্ট অফিসের ধারে রমাবানিজ্যের বাড়ি যাবো. শৈলেন বলে ওঠে. মেসো মশাইয়ের এককালে খুব নাম ছিলো, এদিকে ব্রাহ্মণ তারওপর জমিদার.
_____ কে শৈলেন খোকা???
ভ্যানের সামনে একটা থলে মতন কিছু ঝোলানো, তার ভেতর থেকে একটা দেশলাই আর একটা কূপি বার করে জ্বালায়.
অন্ধকারে একটু আলোর দেখা পেয়ে শৈলেন ও যেন একটু নিশ্চিন্ত হয়.
_____ হ্যাঁ আমি, কিন্তু আপনি চিনলেন কি করে?
_____ তুমি তো আগে প্রায় ই এইখানে আসতে
______ সেওতো প্রায় পাঁচ সাত বছর আগে
______ দেখো তো খোকা চিনতে পারো কিনা, কূপি টা মুখের সামনে তুলে ধরে
কাঁচা পাকা দাড়ি, গলায় গামছা, নোংরা মুখে ফোকলা হাসি, স্মৃতির ডাল পালা হাতরে মনে পড়ে, অজয় খুঁড়ো না ! আগে প্রায় ই মাসির বাড়ি আসলে ষ্টেশন থেকে ভ্যানে করে নিয়ে যেতো, আবার ফেরবার সময় ষ্টেশনে পৌঁছে দিত .
______অজয় খুঁড়ো তুমি -
______ চিনতে পেরেছো তাহলে - বসো আর দেরি করেনা, রানীমা অপেক্ষা করছে.
গ্রামের সবাই মেসো কে রাজাবাবু আর মাসি কে রানীমা বলেই ডাকতো, বাইরের পৃথিবী পাল্টে গেলেও গ্রামটা আগের মতোই আছে.
ষ্টেশনে বারোটার ঘন্টা পড়তে শোনা গেলো.
___ বসো শৈলেন খোকা
শৈলেন ভ্যানে উঠে বসে, অজয় খুঁড়ো ভ্যান টানতে শুরু করে, কিছুটা মাঠের ভেতর দিয়ে তবে গ্রামের পথ, আধ ক্রোশ পথ হবে. কুপির আলোটা হাওয়ায় কাঁপছে. অজয় খুঁড়োর পা ভ্যানের চাকায় উঠছে আর নামছে নিস্তব্ধতা কে কাটাতে শৈলেন জিজ্ঞেস করে
_____ তোমার বাড়িতে কে কে আছে গো খুঁড়ো
_____ তোমার খুড়ীমা অনেকদিন হোলো গত হয়েছেন আমার এক মেয়ে কে রানীমা আশ্রয় দিয়েছেন, ওর মা চলে যাবার পর থেকে , সেও ----
কথা শেষ না হতেই ভ্যানের চাকার তলায় বুঝি কোনো কুকুরের বাচ্চা এসে গিয়েছিলো কিঁউ মিউ শব্দে সরে গেলো.
___ আর কতো দূর খুঁড়ো
___ এই তো এসে গেছি
শৈলেন তাকিয়ে দেখে হ্যাঁ মাসির বাড়ির বাইরে বড়ো গেট, গেটের সামনে ভ্যান এসে দাঁড়িয়েছে. শৈলেন নেমে অজয় খুঁড়ো কে পকেট থেকে টাকা বার করে দিতে যায়,
খুঁড়ো ফোকলা হাসি দিয়ে
____ লাগবে না, রানীমা দে দেছেন.
বলেই ভ্যান নিয়ে চলে যেতে লাগে.
____ শোনো খুঁড়ো কাল সকালে স্টেশন যাবো..
খুঁড়ো উত্তর দেয়না. অন্ধকারে হারিয়ে যায়. কুপির আলোটাও মিলিয়ে যায়. লোডশেডিং তাই বলে মাসি একটাও আলো জ্বালাবেনা এ কেমন কথা? অন্ধকারের ও একটা আলো থাকে, সেই আলোতেই গেট খুলে ভেতরে ঢোকে শৈলেন.
___ মাসি ও মাসি আমি শৈলেন
আরো একটু এগিয়ে যায়, পাঁচ বছর আগে শেষ যখন এসেছিলো, কত জমজমাট থাকতো, মেসো তখন ও বেঁচে, বছর দুয়েক হোলো মেসো মারা গেছে. গ্রামটার কোনো উন্নতি হয়নি মাসির কাছে ফোনে খবর পেতো. কতবার মাসিকে বলেছে গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে শহরে চলে আসবার জন্য. মাসির নিজের কোনো সন্তান নেই, ফোন বলতে সেই পোস্ট অফিসের ফোন. মাঝে মাঝে ফোনে বলেছে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে যাবেনা, মাসির কাছে শুনেছিলো একবার খুঁড়োর মেয়ের কথা. প্রায় মাস তিনেক আগে বৃষ্টির সময় মাসি একবার ফোন করেছিলো বৃষ্টির সময়, বন্যার আশঙ্কা ছিলো, সবাই গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলো, মাসি বলেছিলো গ্রাম ছেড়ে সে যাবে না, কতবার শৈলেনের মা বাবাও বলেছে শোনেনি.
____ আপনি শৈলেন দা
পাশের থেকে এক মেয়ের গলা পেয়ে ঘুরতেই
_____ মাসি বলছিলো আপনার আসবার সময় হয়ে গেছে. আসুন এইদিকে আস্তে ভাঙা চোরা সিঁড়ি, বন্যার সময় জল ঢুকে নিচের তলার সবটাই নষ্ট হয়ে গেছে.
শৈলেন মনে মনে ভাবছে এই বুঝি সেই খুঁড়োর মেয়ে,
_____ আমি মালা-
_____অজয় খুঁড়োর মেয়ে??
_____ হ্যাঁ
লণ্ঠনের আলোয় মেয়েটার মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না এতো অন্ধকার চারিপাশে.
____ আলো আসবেনা. একবার গেলে দুই তিন দিনের মধ্যে দেখা নেই.
শৈলেন একটু অবাক হয়, মেয়েটাকি মন পরতে পারে, যে কথাই ভাবছে, তার ই উত্তর দিয়ে দিচ্ছে.
_____ মাসি মাসি, শৈলেন দাদাবাবু এসেছে -
ওপর তলায় মাসির ঘর ছিলো, এঘর শৈলেনের চেনা, ছোটবেলায় কত এসেছে
_____ শৈলেন এসেছিস বাবা
_____ মাসির গলার আওয়াজে দক্ষিণের বারান্দার দিকে তাকায়, মাসির ঘরের লাগোয়া এই বারান্দা, আগেও মাসি অবসর সময়ে বারান্দায় বসে থাকতো.
অন্ধকারে মাসির মুখটাও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেনা. তবু গলার স্বর, শাড়ি পড়বার ধরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে এই তার সোনা মাসি. এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতে যায়, মাসি বাঁধা দিয়ে বলে, মেলা রাত হয়েছে, হাত মুখ ধুয়ে এসে খাবার খেয়ে নে. সেই কখন বেরিয়েছিস. তারপর তোকে একটা জিনিস দেবো.
____ কি জিনিস
____ এ বাড়ির দলিল, পুরোনো গয়না, একশো বছরের পুরোনো, এ পরিবারের সাত কূলে কেউ তো নেই তাই সব তোকেই দিয়ে যাবো, আমি আর কতদিন আগলে রাখবো বল -
____ সে কাল দেখা যাবে. তোমাকে আমি এবার নিয়েই তবে যাবো.
হাত মুখ ধুয়ে এসে খেতে বসে শৈলেন, মাসি আজ ও মনে রেখেছে তার পছন্দের সব খাবার. খেয়েদেয়ে এবার একটু শুয়ে ঘুমিয়ে নেবে ভাবছে, অজয় কাকা কে না বললেই হতো ভোরের ট্রেন ধরবে, আসলে জানিয়ে দেবে, যাবেনা. একদিন থেকে তারপর ফিরবে.
_____ কিরে শুয়ে পড়েছিস
মাসির ঘরেই গা এলিয়ে দিয়েছে, এই ঘরেই একটু আলো, এতো বড়ো জমিদার বাড়ি, অন্ধকারে ভুতুড়ে বাড়ি লাগছে.
____ হ্যাঁ মাসি কোথায় শোয়ার ব্যবস্থা করেছো আমার, অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হচ্ছে না
_____ এখন শুয়ে কি করবি, তোর জিনিস গুলো আগে সামলা, -
_____ কাল দেখবো
______ না এখন ই
অগত্যা, ইচ্ছা না থাকলেও সায় দিতে হোলো কোই দেখাও
____ তোর ব্যাগে এগুলো ঢুকিয়ে নে-
অন্ধকারে তেমন কিছু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না, মনে হোলো দলিল জাতীয় কাগজ পত্র, আর একটা পুরোনো গয়নার বাক্স. ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয় শৈলেন,
____ এগুলো কাল দিলে হতো না, আর তুমি এবার আমার সাথে যাবে.
কথাটা বলে আদরে জড়িয়ে ধরতে গিয়েই কেমন হাত পা ঠান্ডা হয়ে ঝট করে সরে এসে পাশে রাখা হেরিকেন টা সামনে নিয়ে এসে ধরলো ভয়ে আঁতকে উঠলো শৈলেন, এ কি দেখছে কঙ্কালের গায়ে শাড়ি পেঁচানো, ভয়ে হাত থেকে হেরিকেন টা পড়ে এদিক ওদিক তেল ছিটকে আগুন জ্বলছে, কঙ্কাল চেহারা র নির্লিপ্ত চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে,
____বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে, আমি প্রাণে বেঁচে ছিলাম, কিন্তু জল নামার সাথে সাথে রোগে ধরলো পুরো গ্রাম শেষ হয়ে গেলো, বাড়িটার ওপর নজর আছে পাশের গ্রামের পঞ্চায়েতের তাই সব তোর নামে করেই রেখেছিলাম দিয়ে গেলাম. আমিও বেঁচে নেই রে বাবু.
শোনা মাত্রই দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো শৈলেন
___ আস্তে ভাঙা আছে
অজয় খুঁড়োর মেয়ের কথায় ঘুরে দাঁড়ায় শৈলেন কাছে এগিয়ে জিজ্ঞেস করে
____ আমার মাসি
আর কিছু বলতে পারেনা
_____ আমার হাত টা ধরো দাদাবাবু অন্ধকারে পড়ে যাবে
কেমন যেন ঘোরের মধ্যেই হাত টা ধরে, বরফের মতো ঠান্ডা, এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে ছুটতে ছুটতে নেমে এসে গেট দিয়ে বেরিয়ে আসে, অজয় খুঁড়ো ভ্যান রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে ই আছে
____ খুঁড়ো স্টেশন চলো
খুঁড়ো ও ছুটতে থাকে রিক্সা নিয়ে. সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে অন্ধকার মাঠ ঘাট পেরিয়ে খুঁড়োর রিক্সা স্টেশনের মুখে এসে দাঁড়ায় শৈলেন নেমে স্টেশনের দিকে এগোতে থাকে,
___ খোকা বাবু
___ খুঁড়োর ডাকে শৈলেন ফিরে তাকায়
মনে ভাবে খুঁড়ো কে টাকা দেবে কি করে সব কিছু তো মাসির বাড়িতেই ফেলে এসেছে.
____ তোমার ব্যাগ
ভ্যান থেকে শৈলেনের ব্যাগ টা নামিয়ে দেয়
শৈলেন ভাবে ব্যাগ টা তো সে ফেলে এসেছিলো. শৈলেন কিছু বলতে পারেনা. মাথা ঘুরছে.
লোকজনের কথা বার্তা শুনতে পাচ্ছে, চোখ খুলতেই দেখে তাকে ঘিরে রয়েছে বেশ কয়েকজন সকালের আলো ফুটেছে.
____ কি মশাই এখন ভালো লাগছে???
ট্রেন ঢুকছে আপনি যাবেন??
____ শৈলেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়.
ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে শৈলেন এগোতে যায়
_____ ও মশাই ব্যাগ নিয়ে যান.
শৈলেন ব্যাগ টা নিয়ে ট্রেনে উঠে বসে, বিশ্বাস হচ্ছে না কিছু ই, ব্যাগ টা খোলে নিজের জামা কাপড় ছাড়া কিছুই তো নেই. তাহলে পুরোটাই কি স্বপ্ন দেখছিলো মাসির বাড়ি কি পৌঁছাতে পারেনি, ট্রেন চলতে লেগেছে ততক্ষনে, ব্যাগের সামনের খাপে সিগরেট আছে বার করবার জন্য চেন খুলে হাত দিতেই চমকে ওঠে, ভালো করে দেখতেই চোখে পড়ে দলিল, শক্ত মতো কি যেন হাতে বাঁধছে, একি সেই গয়নার বাক্স....
____ কি মশাই এখন ভালো লাগছে???
ট্রেন ঢুকছে আপনি যাবেন??
____ শৈলেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়.
ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে শৈলেন এগোতে যায়
_____ ও মশাই ব্যাগ নিয়ে যান.
শৈলেন ব্যাগ টা নিয়ে ট্রেনে উঠে বসে, বিশ্বাস হচ্ছে না কিছু ই, ব্যাগ টা খোলে নিজের জামা কাপড় ছাড়া কিছুই তো নেই. তাহলে পুরোটাই কি স্বপ্ন দেখছিলো মাসির বাড়ি কি পৌঁছাতে পারেনি, ট্রেন চলতে লেগেছে ততক্ষনে, ব্যাগের সামনের খাপে সিগরেট আছে বার করবার জন্য চেন খুলে হাত দিতেই চমকে ওঠে, ভালো করে দেখতেই চোখে পড়ে দলিল, শক্ত মতো কি যেন হাতে বাঁধছে, একি সেই গয়নার বাক্স....

No comments:
Post a Comment