Wednesday, April 29, 2020

জীবনে ভাগ্যের খেলা


জীবনে ভাগ্যের খেলা
মিষ্টি দে

যত সময় এগোচ্ছে সুদেষ্ণা যেন বুঝতে পারছে জীবনের সমস্ত ঘটনা, প্রকৃতির প্রতি মুহূর্তের পরিবর্তন ভাগ্যের খেলা ছাড়া কিছুই না.  লকডাউনের ঠিক আগের দিন হেঁদো গ্রামের এই বাড়িতে এসে আটকে পড়েছে,  সেই থেকে কপালে কষাঘাত করছে, কি অলক্ষনে যে এসেছিলো, বাড়িতে থাকলে কি সুখেই না থাকতে পারতো.  লকডাউনে অফিসেও যেতে  হতোনা,  বিন্দাস ছুটি কাটানো যেতো. 
গ্রামের এই বাড়িটা সুদেষ্ণার শশুরের ভিটে,  সুদেষ্ণার স্বামীরা চার ভাই, সুদেষ্ণার স্বামী বিয়ের এক মাসের মধ্যেই গত হয়েছিলেন.  কলকাতায় সরকারি অফিসে চাকরি করতেন,  সেখানেই মেসে থাকতেন,  বিয়ের পরে আলাদা ঘর নেওয়ার কথা ছিলো, সে সময় বিধাতা দেননি.  সুদেষ্ণা চাইলে স্বামীর চাকরি অনায়াসেই পেতে পারতো, কিন্তু সে চায়নি,  মনে মনে ভেবেছিলো যে স্বামীর সাথে একদিনের সংসার করা হলোনা তার চাকরিতে ও কোনো অধিকার নেই তার. অ্যানিমেশন নিয়ে পড়াশোনা করেছে সুদেষ্ণা. সেই বিষয়ক চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিলো অল্প কিছুদিনের মধ্যে. বিয়ের একমাসের মধ্যে স্বামীর মৃত্যু, শ্বশুর বাড়ির লোকজন যে ভালো চোখে দেখবে না সেটাই স্বাভাবিক. 
সুদেষ্ণার স্বামীর অংশটুকুও এরকম অপয়া বৌ কে দিতে চায়নি, কিন্তু সুদেষ্ণার কাকা জাঁদরেল উকিল সুদেষ্ণা র স্বামীর অংশটা আদায় করে ছেড়েছে,  সেই অংশেই ভাড়া বসানো,  দুই তিন মাস অন্তর সুদেষ্ণা আসে,  দেখাশোনা করে ভাড়া নিয়ে চলে যায়,  তবে সে টাকা নিজের জন্য খরচ করেনা একেক বার একেক আশ্রমে দান করে দেয়,  সুদেষ্ণা ভাবে যে বিয়েটা কোনো বিয়েই নয় তার টাকা নিজের জন্য কি করে খরচ করবে সে !  সুদেষ্ণা তো বিয়েটাই করতে চায়নি.  কিন্তু ওইযে ভাগ্যের খেলা, সুদেষ্ণার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছিলো. মাঝে মাঝে কাকার ওপরই রাগ হয়. 
সুদেষ্ণার বাবারা দুই ভাই, সুদেষ্ণার বাবার নাম ছিলো মোহন, আর কাকার নাম মদন.  সুদেষ্ণা র বাবা প্রায় ই বলতো আমরা দুজন হর হরি আত্মা.  কথাটা মিথ্যা ছিলোনা.  দুই ভাই এর খুব মিল ছিলো.  এই মিলই সুদেষ্ণার জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছে, মাঝে মাঝে স্মৃতি গুলো কেমন পরিষ্কার হয়ে ওঠে,  সুদেষ্ণার বাবার ক্যান্সার ধরা পরে, শেষ অবস্থা,  কিছুই করবার নেই,  অসহায় পিতার পিতৃ স্নেহ কাতর হয়ে উঠেছিলো,  মেয়েটার বিয়েও দিতে পারলোনা,  সুদেষ্ণার তখন কত আর বয়েস কুড়ি  পেরিয়ে একুশে পড়বে. কাকাই  তখন বিয়ের সম্বন্ধ টা নিয়ে এসেছিলো, ছোটো সুদেষ্ণার আপত্তি  বা মতামত কোনো কিছুরই গুরুত্ব ছিলোনা সেদিন. বাবার মুখের দিকে চেয়ে কিছু বলতে পারেনি সেদিন.  অরুনের কথাটাও না. বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো আজ প্রায় পনেরো বছর বাদে ও অরুনের মুখটা সুদেষ্ণার অনুভূতি গুলোকে নাড়িয়ে দেয়.  অরুন তখন মেডিকেল কলেজের শেষ বছরের ছাত্র.  উজ্জ্বল ভবিষ্যত. সুদেষ্ণা কে গ্রহণ করে নিতে পারতো কি???  ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিলো সুদেষ্ণা তবু অরুনকে কিছুই বলতে পারেনি.  অরুন তখন দিল্লী, সুদেষ্ণার বিয়ে হয়ে যায়,  সপ্তাহ খানেকের মধ্যে জীবনটাই পাল্টে গিয়েছিলো. ফুল শয্যার রাতে স্বামী শোভনকে অরুনের কথা বলতে দ্বিধা করেনি সুদেষ্ণা, কোনো মিথ্যা দিয়ে সে নতুন জীবন শুরু করতে চায়নি.  পরের দিন সকাল বেলা শোভন কলকাতায় ফিরে গিয়েছিলো,  আর ফেরেনি. অফিস থেকে ফেরবার সময় পথ দুর্ঘটনায়....
এসব সুদেষ্ণা মনে করতে চায়না. মনে মনে ভাবে শোভনের মৃত্যুর জন্য  সেকি দায়ী???  মিথ্যে নিয়ে শুরু করতে চায়নি সে.  ভাগ্য তাকে নিয়ে সবসময় খেলা করেছে. অরুনের সাথে কাটানো সময়গুলো আজও মনে পড়লে ভালো লাগে সুদেষ্ণার,  কেমন একটা ভালো লাগা ছিলো,  সুদেষ্ণা ভাবে বুটাইদার সাথে দেখা করতে প্রায়ই আসতো অরুন.  বুটাই কাকার ছেলে,  সুদেষ্ণার অনেক বড়ো. সুদেষ্ণা তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে. বুটাইদা আর অরুন একই সাথে পড়াশোনা করতো. উঁচু লম্বা,  শ্যামলা গড়ন, বড়ো বড়ো চোখ অরুনকে বেশ লাগতো সুদেষ্ণার,  এখন ভাবে হয়তো অল্প বয়েসের ভালোলাগা. দূর্গা পুজোর সময়, বাড়ির পিছনের লাগোয়া বারান্দায় তখন খুব একটা কেউ যেতনা,  সামনের দালানে পুজোর জায়গাতেই সবাই থাকতো,  সুদেষ্ণার  আজ সেই কথাগুলো খুব মনে পড়ছে , সেদিন ছিলো দূর্গা ষষ্টি,  পাড়ার একটা ছোটো মেয়ে এসে বলেছিলো পিছনের দালানে বুটাই দা ডাকছে. সুদেষ্ণা পিছনের দালানে এসে কাউকে কোথায় দেখতে পায়নি,  ফিরে যাবার সময়, 
_____ কি হোলো চলে যাচ্ছ???
_____একি অরুণদা তুমি আমায় এখানে ডাকলে কেন? মুহূর্তে বুকের ভেতর টা যেন শুকিয়ে গিয়েছিলো,  সেটা কি ভয়, লজ্জা,  আজও জানে না সুদেষ্ণা.
_____ কি ভাবছো সুদেষ্ণা? অমন চুপি চুপি আমাকে দেখো কেন বলোতো???
কথাটা শোনা মাত্রই সারা বিশ্বের লজ্জা যেন গ্রাস করেছিলো, সুদেষ্ণা পালিয়ে যেতেই চেয়েছিলো,  সুদেষ্ণাকে পালতে দেয়নি অরুন, কাছে টেনে ঠোঁট দুটোকে জ্বালিয়ে দিয়েছিলো.....
পুরোনো স্মৃতি থেকে মালতি র ডাকে ফিরে আসে সুদেষ্ণা. 
_____ দিদি তোমার রান্না করে দিয়েছি,  টেবিলে ঢাকা দেওয়া আছে. জ্বর টা কি কমেছে?
______ ওই একরকম
______ তোমাকে বললাম আশ্রম এর সাধু বাবার কাছ থেকে ওষুধ এনে দি, শুনলে না.  গ্রামে উনি আমাদের ভগবান.
উত্তর দেয়না সুদেষ্ণা.
_____ আসছি দিদি কাল সকালে আসবো. সুদেষ্ণা এখানে আসলে মালতি ই দেখাশোনা করে.
মালতি সুদেষ্ণার খুব খেয়াল রাখে, কাল ই বলছিলো "কি গো দিদি তুমি এতো সুন্দর দেখতে, যখন প্রথম বৌ হয়ে এসেছিলে, কি মিষ্টি লাগছিলো,  অযত্নে কি অবস্থা করেছো নিজের,  অল্প বয়েসে তোমার স্বামী চলে গেছে, এতে তোমার কি দোষ !
শোভন এর জন্য না নিয়তির নিষ্ঠুর আঘাতের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ.. আবার সুদেষ্ণা পুরোনো স্মৃতিতে ডুবে যায়, সে ভাবতে  থাকে... অরুণ অল্প দিনেই সুদেষ্ণার  মনের গভীরে জায়গা করে নিচ্ছিলো,  সুদেষ্ণা মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলো. টুবাইদার কাছে শুনেছিলো মিলিটারি ডক্টর হয়েছে অরুন.  তারপর হটাৎ ই হারিয়ে যায়, পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি দুর্ঘটনায়...  অরুন ও চলে গিয়েছিলো,  অরুন দিল্লী যাবার আগে সুদেষ্ণা কে বলেছিলো
___ সুদু আমার জন্য অপেক্ষা করবে তো,  দিল্লী থেকে ফিরে আর মাত্র  এক বছর, তারপর তোমাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবো...  মা বাবা আমার নেই, জানোই তো,  বছর দুয়েক হোলো তারা পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন,  তুমি ই আমার সব,  দুই হাতে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছিলো,
______ সুদেষ্ণা কথা রাখতে পারেনি,  এক বছর কেন,  তার বাবার কাছে যে একটুও সময় ছিলোনা, শোভনের মৃত্যু সংবাদ তার বাবাকে আর বাঁচাতে পারেনি.
জ্বর টা বাড়ছে মনে হচ্ছে, লকডাউনের সময় তাও আবার এই হেঁদো গ্রামে ডাক্তার পাবে কোথায় ! লকডাউন কাল শেষ হয়ে যাবে, শহরে ফিরেই ডাক্তার দেখাতে পারে,  কিন্তু যদি বাড়াবাড়ি হয়, কাল কি একবার সেই সাধুবাবার ওষুধ আনতে বলবে,  ধুর কি সব আজে বাজে ওষুধ দেবে,  না একবার চোখে দেখে এলে কেমন হয়, মোবাইল টা বার করে মালতি কে ফোন লাগায়
____মালতি বাড়ি চলে গেছিস,
____ না দিদি
____ একবার আশ্রমে নিয়ে যাবি, তোদের সাধুবাবার কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে আসি,
ওদিক থেকে মালতি বলে ওঠে
____ না দিদি আমি একাই নিয়ে আসছি, তুমি কষ্ট করবে কেন?
____ নারে মালতি আমি একটু যাবো, 
____ আচ্ছা দিদি আমি আসছি.
সুদেষ্ণা ভাবে এবারের ভাড়ার টাকাটা এই আশ্রমেই দিয়ে যাবে.  এক ই তো ব্যাপার.
পায়ে হাঁটা পথ, গ্রামের দক্ষিণ দিকের পুরোনো মন্দির.  মালতি আসতে আসতে সাধুবাবার গল্প বলতে লাগে. 
___ দিদি এই মন্দিরে খুব একটা পুজো অর্চনা হতোনা.  এই বছর কয়েক হোলো কোথা থেকে এই সাধুবাবা এসেছে সাক্ষাৎ ভগবান.  মন্দির টা কি সুন্দর গুছিয়ে নিয়েছে,  গ্রামের ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা শেখায়,  কেউ অসুস্থ হলে ওষুধ দেয়,  শহর তো মেলা দূর. সাধুবাবা সাক্ষাৎ ভগবান. 
সুদেষ্ণা মালতির কথা শুনতে শুনতে মন্দিরের কাছে এসে উপস্থিত হয়,  ঠিকই বলেছে মালতি কত ফুলের গাছ, হ্যাঁ বেশ সাজিয়েছেন,  এতো দিন এখানে এসেছে কোনদিন এদিকটায় আসা হয়নি, আসতেও চায়নি.  মালতি ছুটে আশ্রমে সাধুবাবার ঘরের দিকে চলে গেছে, এখন লকডাউনের জন্য  সাধুবাবাও ছেলেদের পড়ায় না, মালতির কাছেই শুনছিলো.
কালকে ফিরে যাবে কলকাতা শরীর টা সায় দিলে হয়.  
______দিদি সাধুবাবা ডাকছে তুমি যাও, আমি ঠাকুরের কাছে মাথা ঠুকে আসছি.
ওইযে সাধুবাবার ঘর, তোমার কথা বলেছি.
সুদেষ্ণা সন্যাসীর ঘরের দিকে এগোয়. ঘরের সামনে এসে দেখে সন্যাসী পিছন ঘুরে বই ঘাঁটছে, সুদেষ্ণার পায়ের শব্দে সন্যাসী বলে ওঠে
____আসুন কি হয়েছে আপনার -
মুহূর্তে সুদেষ্ণার রক্ত যেন হিম হয়ে গেলো,  এ কণ্ঠস্বর তার তো খুব চেনা
____ কি হোলো আসুন
বলেই সন্যাসী ঘুরে তাকালেন সুদেষ্ণার দিকে.
সুদেষ্ণা আরো চমকে গেলো,  কি দেখছে সে, কাকে দেখছে,  সময়ের স্রোতে যেটুকু পরিবর্তন হয়, সেই সুঠাম চেহারা, আবেগ ভরা দৃষ্টি. এই দৃষ্টি তো সুদেষ্ণা ভুলতে পারেনা. অরুন, বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে, কতদিনের চাপা দুঃখ আজ যেন বাঁধ ভেঙে ফেলতে চাইছে, ছুটে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে, পারছেনা,  হাজার প্রশ্ন, প্রশ্ন হয়ে পাগল করে দিচ্ছে, অসুস্থ শরীর বোধহয় আর নিতেও পারছেনা চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসছে,  অরুন কি আবার হারিয়ে যাবে, সুদেষ্ণা আর দাঁড়াতে পারছেনা, অরুন সুদেষ্ণা কে ধরে পাশের চৌকিতে বসিয়ে দেয়,
_____ এ কি অবস্থা করেছো সুদু
সুদেষ্ণা লজ্জা পেয়ে যায়, আজ ই মালতি বলছিলো অযত্নে তার চেহারা আর নেই, নিজেকে সামলে নিয়ে বলে
_____ তুমিও তো
_____ সে তো তোমার ই দান সুদু
_____ বিশ্বাস করো
_____ জানি তুমি নিরুপায় ছিলে কাকা বাবুর অসুস্থতা
_____ তুমি ফিরে এসেও কোনো যোগাযোগ করোনি কেন?
______ তোমার সুখের সংসারে
______ আমার সংসার তো একদিনের
______ হুম মালতির কাছে শুনেছি,  ও ওর মার জন্য ওষুধ নিতে মাঝে মাঝে আসে, শুধু বুঝতে পারিনি ওর দিদিমনি আর কেউ নয় তুমি..
সুদেষ্ণার চিন্তা শক্তিও যেন স্থির হয়ে গেছে.  একটা প্রশ্ন ই মনে উঠে আসছে - আজ আবার এ কোন ভাগ্যের খেলা জীবন তাদের সামনে নিয়ে এসেছে.......


No comments:

Post a Comment