Tuesday, May 5, 2020

টেকআপ

                 টেকআপ 
                  মিস্টি দে


রন্জণ বাবু মাঠের শেষ প্রান্তে বসে দক্ষিণ দিকের লংজাম্পের পীঠের দিকে তাকিয়ে রিম্পার প্রাক্টিস দেখছে৷রিম্পা রন্জন বাবুর এক মাত্র সন্তান৷ রন্জন বাবু নিজেও একসময়  ভালো অ্যাথলেট ছিলেন, এই স্টেডিয়ামের মাঠেই এক সময় তিনিও প্রাক্টিস করেছেন, তিনি ছিলেন জাতীয় স্তরের পোলভল্ট চ্যাম্পিয়ন. মেয়েকে দেখতে দেখতে সেই সব দিনের কথা চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে উঠছে. রিম্পা শারীরিক ভাবে সেরকম সক্ষম নয়  দুর্বল,  আনেমিয়ার পেশেন্ট, রঞ্জন বাবু মেয়েকে তাই সেরকম চাপ ও দেননা কোনো কিছুতে,  রঞ্জন বাবুর কাছে যারা শেখে, তারা খুব পরিশ্রমী, স্টেডিয়াম দশ বার পাক খায়, অনেক এক্সারসাইজ করে, রিম্পা অতো পরিশ্রম করতে পারেনা, তবু রিম্পার ইচ্ছা আছে, একনিষ্ঠতা আছে. রিম্পা দৌড়ে এসে বালির ওপর লাফিয়ে পড়ছে,  রঞ্জন বাবু পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে
_____ হচ্ছে না,  হচ্ছে না,  টেকআপ আরো ভালো করে নিতে হবে,  বডি আরো ওপরে তুলতে হবে
_____ হচ্ছে না?   না বাবাই?
_____ হবে হবে
রিম্পা আবার চেষ্টা করবে বলে দৌড়ে পিছনের দিকে ছুটে যায়.
মনসংযোগ করে ছুটে আসে,  টেকআপ নিয়ে লাফিয়ে পড়ে.  রঞ্জন বাবু মেজারমেন্ট টেপ টা বার করে
_____ সুভাষ কত হোলো দেখোতো -
সুভাষ রঞ্জন বাবুর ছাত্র...  রঞ্জন বাবুর কাছেই শেখে. সুভাষ মেজারমেন্ট টেপ নিয়ে মাপতে শুরু করে.
______চোদ্দ ফুট স্যার.
ভালো হয়েছে স্যার. রিম্পা আগের থেকে অনেক ভালো করছে.
রঞ্জন বাবু মনে মনে খুশিই হন.  রঞ্জন বাবুর অসুস্থ মেয়ে.  মনে মনে ভাবেন এই চেষ্টাটাই অনেক. শেষ বছরের  রাজ্য স্তরের রেকর্ড পনেরো ফুট ছিলো, রঞ্জন বাবু স্পোর্টস এসোসিয়েশন এর মেম্বার. আগেই খবর নিয়েছিলেন. মনের ভেতর হয়তো একটা খচখচানি দানা বাঁধছিলো মুহূর্তে সরিয়ে দিয়ে সুভাষ কে বললেন
_____ তোমার প্র্যাকটিস কেমন হোলো, কুল ডাউন এক্সারসাইজ টা করেছো তো.
____ হ্যাঁ স্যার
_____ আর প্রসেনজিৎ,  সমর ওরা তো আজ আসলোনা,  আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি.
_____ স্যার সমর আর  রিম্পা ছাড়া তো রাজ্য স্তরে
_____ আঃ ক্লাব স্পোর্টস গুলো তো আছে,
জেলা স্তরে, প্রতিযোগিতা খুব একটা জোরালো ছিলোনা,  রিম্পা সহযেই রাজ্য স্তরে চলে গেছে,  সমর বরাবরই ভালো, ওযে রাজ্য স্তরে পৌঁছাবে রঞ্জন বাবু আগেই জানতেন.  সমরের ইভেন্ট 100mtrs. run. তবে খুব কি সহজ ছিলো রিম্পার রাজ্য স্তরে আসা?  বারুইপুরের স্বরস্বতী নস্কর, ওকে টপকে এগোনো, তাই বা কি করে হয়,  শেষের লাফ টা স্বরস্বতী তো দিতেই  পারেনি, বুকে অম্বলের ব্যাথায় ছটফট করছিলো, শেষ লাফটা দিতে পারলে, তাও বা কি করে হয়, পাঁচটা লাফ তো দিয়েছিলো, বাড়ি ফিরতে ফিরতে হাজার কথা রঞ্জন বাবুর মাথায় কিলবিল করছে, রিম্পার অসুস্থতা রিম্পার প্রতিবন্ধকতা, নইলে মেয়েটার টেকআপ নেওয়ার ধরণ, সিজারিং টেকনিক টা কি সুন্দর আয়ত্ব করেছে,   রিম্পা খুব আশায় আছে, শুধু রঞ্জন বাবু বুঝতে পারছেন হয়তো অতটা সোজা হবেনা,  শারীরিক শক্তির ও প্রয়োজন,  তবুও মেয়েকে উৎসাহ দিতেই হবে, জেতা ই তো বড়ো কথা নয়,  প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করলেও চরিত্র গঠন হয়,  নিজের ভাবনা কে দূরে সরিয়ে দিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন,  সাইকেলের সামনে বসিয়ে মেয়ে কে নিয়ে ফিরছেন রঞ্জন বাবু
_____  বুঝলি মা,  এটাই হোলো সুবর্ণ সময়,  আর মাত্র এক সপ্তাহ,  ভালো করে প্র্যাকটিস টা চালিয়ে যা, 
_____ বাবাই, তুমি বলছো এটা সুবর্ণ সময় -
_____ হ্যাঁ রে মা,  তোর যা পারফরম্যান্স হচ্ছে এটাকেই রেখে দিতে হবে. তারপর দেখবি তোকে আর কেউ আটকাতে পারবে না.
সামনে কমলা লেবু বিক্রি করছে একজন,  রঞ্জন বাবু সাইকেল দাড় করালেন,  মেয়েকে একটা লেবু কিনে দিলেন, প্রায়ই প্র্যাকটিস থেকে ফেরবার পথে কিছু না কিছু কিনে দেন রঞ্জন বাবু মেয়েকে, রিম্পা কমলা লেবু ছাড়িয়ে এক কোয়া বাবার মুখে ঢুকিয়ে দেয়. রঞ্জন বাবুর স্ত্রী বানী গেটের সামনে মেয়ের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন, রিম্পা সাইকেল থেকে নেমে ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে,
_____ মা জানো আমি চোদ্দ ফুট লাফিয়েছি -
বাণী একবার রঞ্জন বাবুর দিকে তাকায়,  তারপর রিম্পাকে বলে
____বুঝেছি, বুঝেছি, তবে সারাদিন এসব করলে হবে,  পড়তে বসতে হবে তো,  ক্লাস নাইন,  সামনের বছর মাধ্যমিক. যাও  ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে তবে পড়তে বসবে কিন্তু - 
_____ না আমার ক্ষিদে পেয়েছে খেতে দাও
_____ দেবো আগে হাত মুখ ধুয়ে আয়
_____ কি খাবার
_____ দুধ
কথা শেষ না হতেই রিম্পা ছিঁচকাঁদুনের  মতো কেঁদে উঠলো
____ না আমি দুধ খাবোনা,  দুধে গন্ধ
____ রঞ্জন বাবু আদরের সুরে বললেন,  দুধ খাবোনা বললে হবে,  সামনে প্রতিযোগিতা !
রিম্পা ভেতরে চলে যায়. 
_____ তোমার আদরে মেয়েটার বারো বাজছে.
রঞ্জন বাবু হোহো করে হেসে উঠলেন,  সাইকেল বারান্দায় তুলতে তুলতে বললেন
_____ শুধু আমার আদরে??
কথাটা সত্যি,  বাণী দেবী,  রঞ্জন বাবু দুজনেই মেয়েকে খুব ভালোবাসেন,  একমাত্র মেয়েকে নিয়েই সব স্বপ্ন সাজানো.  
_________ কাল সকাল সকাল মেয়েকে নিয়ে একটু বেরোবো, বুঝলে বাণী -
_____ কেন কোথায় যাবে?
_____ একটা ভালো রানিং শু কিনে দেবো.
____ কি মনে হয় ও পারবে?
____ কেন পারবে না,  খুব ভালো করছে.
কথাগুলো রঞ্জন বাবু বললেও মনে মনে একটা দ্বিধা কাজ করছে.  বাণী এতদিন ধরে রঞ্জনের সাথে থাকতে থাকতে অনায়াসেই চোখ পড়তে পারে.  তবে সব সত্য হয়তো বলতে নেই,  তাই  বাণী ও একটু সময়  চুপ করে,  কথা ঘুরিয়ে বলে
____ রিম্পা এলে তুমিও হাত মুখ ধুয়ে এসো খেতে দিচ্ছি.


নতুন রানিং শু, রিম্পা খুব খুশি,  রঞ্জন বাবুও খুব খুশি,  সিনথেটিক ট্রাকে এই রানিং শু তে অনেক সুবিধা হবে. রঞ্জন বাবু অনেকদিন ধরেই ভাবছিলেন মেয়েকে একটা ভালো রানিং শু কিনে দেবেন, আগের বার পুরোনো রানিং শুতে অনেক অসুবিধা হয়েছিলো রঞ্জন বাবু বুঝতে পেরেছিলেন এবার নতুন রানিং শু না দিলে বাঘা বাঘা প্রতিযোগীদের সাথে মুখোমুখি হওয়াই সম্ভব হবেনা . আজ আর মেয়েকে নিয়ে প্র্যাকটিসে যাওয়া যাবেনা,  অনেক বেলা হয়ে গেছে,  একটা ভালো রেস্টুরেন্টে ঢোকে রঞ্জন বাবু, মেয়েকে নিয়ে বেরোলে,  এটা রঞ্জন বাবুর অভ্যেস,  কিছু একটা খাওয়াবেন ই. বাণীর কথা ভেবে প্যাক করেও নিয়েছেন.  রঞ্জন বাবু ভাবেন বাণীও খুব চিন্তায় থাকে মেয়ে কে নিয়ে, দুদিন আগেই,  রিম্পা ওর মামার সাথে বেরিয়েছিলো,  রাস্তায় সেন্সলেস হয়ে যায়.  ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে আসা.  অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে,  জন্ম থেকেই এনেমিক, কিছু করবার নেই,  খাদ্য থেকে রক্ত তৈরী করতে পারেনা শরীর,  সারা জীবন একটু বেশি দেখাশোনায় রাখতে হবে. মেয়েটা জিতবে ভেবে নিয়েছে,  নতুন রানিং শু পেয়ে যেন আরো খুশি. ওয়েটার মটন কোর্মা আর বাটার নান দিয়ে গেছে,
_____ বাবাই দেখো মটন কোর্মা টা খুব সুন্দর বানিয়েছে,
এই রেস্টুরেন্টের খাবার খুব ই ভালো , বাণীকে নিয়েও অনেকবার এসেছে.
____ হ্যাঁ রে মা. খুব ভালো বানায়...
বাড়ির জন্যও প্যাক করে নিচ্ছি.  তোর মা আসলোনা তো.
_____ কি মজা বাবাই,  বাড়িতে গিয়েও খাবো.
____ জানো বাবাই স্কুলে কি হয়েছে
রিম্পা স্কুলের বন্ধুদের গল্প বলতে শুরু করে. বাবা মেয়ের বন্ধুত্ব গল্প কখনই যেন শেষ হয়না.


প্রতিযোগিতার দিন
ভোর রাত্রির থেকে বাণী উঠে পড়েছে  মেয়ের জন্য খাবার তৈরী করেছে,  অনেকটা দূর যেতে হবে, সল্টলেক স্টেডিয়াম. সুভাষ সমর প্রসেনজিৎ তারাও এসে পড়েছে,  সকলের জন্য কিছু খাবার নিয়ে নিয়েছে. রঞ্জন বাবুও মেয়ে কে ঘুম থেকে তুলে বাকিদের কে ফাইনাল ট্রিক দিচ্ছেন.  স্পোর্টস শু,  ট্র্যাকস্যুট সব ঠিক মতো গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে কিনা , শেষ মুহূর্তে বাণীকেই ফাইনাল দেখাশোনা করতে হবে,  নইলে কিছু একটা পড়ে থাকবেই.
বজবজ থেকে সল্টলেক,  অনেকটা পথ পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় 9:30.   দশটা থেকে প্রথম ইভেন্ট শুরু.  মাইকে তার ই ঘোষণা শোনা যাচ্ছে বার বার.  মেয়ের প্রতিযোগিতা ঠিক কখন তার লিস্ট দেখতে গেছেন রঞ্জন বাবু.  এদিকে বাণী মেয়েকে ট্র্যাকস্যুট পরিয়ে তৈরী করছেন.  স্পোর্টস এর দিন রঞ্জন বাবু মেয়েকে বেশি খেতে বারণ করেন, বেশি খেলে শরীর ভারি হয়ে যাবে ভালো লাফানো যাবেনা,  আবার বাণী মনে করে তার এমনিতেই অসুস্থ মেয়ে, বেশি করে না খেলে এতো পরিশ্রমে যদি মাথা ঘোরায়, রিম্পা এতক্ষনে ড্রেস পড়ে তৈরী হয়ে গেছে,  মাঠে হালকা জগিং করছে কি জানি যদি প্রথমে তার ইভেন্ট শুরু হয়. বাণী এদিকে মাঠের একদম কর্নারে ছায়া দেখে বসেছে,  প্রসেনজিৎ, সমর দের সকালের ব্রেকফাস্ট দিচ্ছে,  বাণী রঞ্জন বাবুকে খুব তাড়াতাড়ি এদিকেই আসতে দেখে ভাবছে,  নিশ্চই কারো ইভেন্ট শুরু হবে,  যেমনি ভাবা সেরকম ই ঘটনা, 
______ আঃ সমর খেয়োনা খেয়োনা,  বডি ভারি হয়ে যাবে,  এক্সারসাইজ করো, প্রথম আন্ডার এইটিন মহিলাদের 100mtrs,  তারপর তোমাদের বি  রেডি.  সমর তাড়াতাড়ি খাবার রেখে উঠে পড়লো,
_____ পরে খাবো আন্টি
বলেই হাল্কা জগিং করতে করতে এগিয়ে গেলো. প্রসেনজিৎ আর সুভাষ সাথে এসেছে, ওরা বাবু হয়ে বসে ব্রেকফাস্ট করতে লাগলো.
_____ মেয়ের ইভেন্ট কখোন??
বাণীর প্রশ্নে, একটু মন মরা হয়ে রঞ্জন বাবু উত্তর দিলেন
____ একদম শেষ ইভেন্ট.   মেয়েটা অসুস্থ! এতো দেরিতে ওর ইভেন্ট,  যাক ওকে কিছু খাইয়ে দাও এখন,  আর কিন্তু খাওয়া যাবেনা
_____ তাই হয় নাকি,  আরো দুর্বল হয়ে যাবে
______ না না বডি ভারি হয়ে যাবে
রঞ্জন বাবু স্পোর্টস এসোসিয়েশন এর সদস্য,  একসময়কার জাতীয় স্তরের চ্যাম্পিয়ন এখানে শুধু মেয়েকে নিয়ে আসা না,  ভলেন্টিয়ার হিসেবেও আছেন.  তাই আর সময় নষ্ট না করে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে.চলে গেলেন.  
লাল রঙের ব্লেজার এ বেশ স্মার্ট লাগছে রঞ্জন কে, বাণী এক পলক তাকিয়ে, নিজের মনেই মুচকি হেসে মেয়েকে কাছে ডাকে
_____ আয় খেয়ে নে মা,  তোর বাবা আর পরে খেতে দেবে না.
সমর খুব ভালো দৌড়ায় ও জিতবেই.
মেয়েকে খাইয়ে ব্যালকনি তে গিয়ে বসে বাণী, প্রসেনজিৎ, সুভাষ, সমরের ইভেন্ট শুরু হবে.  রিম্পা ও সাথে এসেছে, তার ইভেন্ট একদম শেষে তাই ব্যস্ততা নেই. সমর  স্টার্টিং পয়েন্ট এ দাঁড়িয়ে রিভালবার এর আওয়াজ,  দৌড় শুরু  প্রসেনজিৎ, সুভাষ চিৎকার করছে সমর , সমর..... সমর ছুটছে সবার আগে, কিন্তু  শেষ মুহূর্তে বেরিয়ে গেলো শিলিগুড়ি. সমর দ্বিতীয়. রঞ্জন বাবু সমরের পিঠে হাত দিয়ে কিছু বোঝাচ্ছে,  দূর থেকে বাণী দেখছে সমর চোখ মুছছে,  হয়তো রঞ্জন বাবু সমর কে এটাই বলছে  দ্বিতীয় হওয়াও কোনো কম কথা নয়.

প্রায় পোনে চারটে বাজে রঞ্জন বাবু বাণীর কাছে মাঠে এসে বসলেন মনটা অস্থির মনে হচ্ছে
_____ কি গো কি হয়েছে
_____ এখানেও রাজনীতি বাণী
______ মানে -
______ স্বরস্বতী নস্কর মনে আছে? জেলা স্পোর্টসে যাকে হারিয়েছিলো  রিম্পা, ও অন্য জেলার প্রতিনিধি হয়ে এসেছে,
_____ কিন্তু এটা তো নিয়ম বিরুদ্ধ বিষয়
_____ কে মানবে বলো,  আর ওকে কে এনেছে জানো?  অমল কবিরাজ?  স্পোর্টস এসোসিয়েশন এ আমার বিরোধী পক্ষ.
বাণী একটু চুপ করে থেকে বলে
_____ তুমি চিন্তা করছো কেনো? তোমার মেয়েকে জিততে হলে, সকলের সাথে লড়ে জিততে হবে,  তুমি স্বরস্বতী কে চেনো তাই ভাবছো,  এরকম কতো স্বরস্বতী আছে,  আর তোমার মেয়ে তো অসুস্থ তুমি জানো,
_____ অমল কবিরাজ তোমার মেয়েকে হারিয়ে তোমাকে হারাতে চাইছে?? সেটা তার চিন্তা, তোমার তো নয়.
রিম্পা কখোন এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে বাণী বা রঞ্জন বাবু দুজনের কেউ ই খেয়াল করেননি,
______ বাবাই আমি চেষ্টা করবো
বলেই ছুটে চলে যায় লং জাম্পের পিঠের দিকে. এক এক করে নাম ডাকা নম্বর মেলানো.
রিম্পার মাথায় মা বাবার কথা গুলো ভাসছে,  সেকি পারবে? সত্যি তো সে অসুস্থ,  বাবার সম্মান কি সে রাখতে পারবে???  প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে. একের পর এক প্রতিযোগী আসছে তাদের বেস্ট দিয়ে যাচ্ছে,  এবার রিম্পার  টার্ন,  রিম্পা দৌড়ে এসে লাফ দিলো কিন্তু একি, কোথায় টেকআপ কোথায় সেই সিজারিং. প্রথমে তিনটে করে জাম্প দেবার সুযোগ তারপর বেস্ট ছয় জন আরো তিনটে সুযোগ পাবে,  দ্বিতীয় জাম্প, ডিসকোয়ালিফাই, রঞ্জন বাবু একবার ছুটে আসছে মেয়ের কাছে আবার চলে যাচ্ছে কে কতো লাফাচ্ছে দেখছে,  প্রথম তিনটে জাম্পের শেষ জাম্প. না এইটা মোটামুটি হয়েছে মেয়েটাকি আরো তিনটে সুযোগ পাবে, ভলেন্টিয়ার রা সকলের জাম্পের মেজারমেন্টের হিসেব করে নাম ঘোষণা করছে, রিম্পা মাঠে বসে পড়েছে, খুব কান্না পাচ্ছে, চেষ্টা টুকুও যেন করতে পারলোনা. 
______নম্বর 6 রিম্পা......
রিম্পা এক লাফে উঠে দাঁড়িয়েছে.  আবার শুরু একের পর এক প্রতিযোগী তার বেস্ট জাম্প দিচ্ছে,  সরস্বতী নস্কর প্রথম স্থানে আছে এখনো, রিম্পা শুধু ভাবছে বেস্ট টুকু দিতে পারি যেনো,  রঞ্জন বাবু ছটফট করছে,  বাণী স্থির হয়ে শুধু মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, শেষের তিনটে জাম্প রিম্পা ছুটে এলো টেক আপ নিয়ে শুন্যে দুটো পায়ের সিজারিং টেকনিক,  এতো সুন্দর তো রঞ্জন বাবু আগে কোনোদিন মেয়েকে দেখেননি, মনে আশা যেনো দানা বাঁধছে, দ্বিতীয় জাম্প, অভূতপূর্ব, কিন্তু স্বরস্বতী এখনো এগিয়ে, রঞ্জন বাবু মেয়ের দিকে এগিয়ে আসে, বাবার চোখে এ ভাষা রিম্পা যেনো আগে কখনো দেখেনি,  বাণী দেখছে লাল ব্লেজার এ রিম্পার বাবা না একজন গুরু এগিয়ে যাচ্ছে তার শিষ্যের কাছে শেষ উপদেশ দিতে,
________ শেষ সুযোগ মা, নইলে সামনে সব ব্ল্যান্ক হয়ে যাবে...  শেষ কামড় মা, শেষ সুযোগ
রিম্পার নাম ডাকা হয়েছে,  রিম্পা দৌড়ে আসছে, সমর, প্রসেনজিৎ, সুভাষ সবাই চুপ, রঞ্জন বাবু মেয়ের দিকে এক  দৃষ্টে তাকিয়ে আছে, বাণী দূর থেকে গুরু শিষ্যের বোঝা পড়া উপলব্ধি করতে চাইছে, টেকআপ বোর্ডে পা রেখে, হাল্কা তুলোর মতো শরীরটাকে শুন্যে তুলে দিয়েছে রিম্পা, শুন্যে সেই সিজারিং টেকনিক, যেনো শুন্যে দৌড়াচ্ছে, তারপর জাম্প..............
ভলেন্টিয়ার রা মেজারমেন্ট টেপ নিয়ে মাপছে,  ভীড় জমে উঠেছে, ভলেন্টিয়ার রা মেজারমেন্ট নিয়ে অফিসের দিকে চলে গেলো, কেউ কোনো কথা বলছেনা, নতুন রানিং শু খুলে, রিম্পা স্পোর্টস শু পড়েছে,  এবার ফেরবার পালা.  মাইকে এক্ষুনি রেজাল্ট বলবে
____আজকের মহিলা বিভাগের আন্ডার ফিফটিন লং জাম্পের বিজেতাদের ভিত্তি স্যান্ডের কাছে ডাকা হচ্ছে, তৃতীয়  রমা মাইতি দ্বিতীয় স্বরস্বতী নস্কর,  আর  তিন বছরের রেকর্ড ব্রেক করে প্রথম হয়েছেন   রিম্পা দেব তার রেকর্ড 4.75mtr. 15ফুট 7ইঞ্চি. মুহূর্তে জয়ের  আনন্দে  রঞ্জন বাবুর চোখে মুখ জ্বল জ্বল করে ওঠে ,  রঞ্জন বাবু আনন্দে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে...  তার অসুস্থ মেয়েটা আজ জিতে গেছে,
_____ বাণী আমার অসুস্থ মেয়েটা জিতে গেছে গো.
বাণীর চোখের কোনায় জল চিক চিক করে ওঠে, অনেক কষ্টে  সামলে নিয়ে বলে
______ আর মেয়ে মেয়ে করতে হবেনা, মেয়ে ভিত্তি স্ট্যান্ডে উঠবে ছবি তোলো....

_____________________________________

English translate

                 Takeup

                 MistiDey


Ranjan Babu sits at the far end of the field and looks at the back of the long jump on the south side watching Rimper practice. Rimpa is Ranjan Babu's only child.  Ranjan Babu himself was once a good athlete, he also practiced in this stadium, he was a national level pole vault champion.  Seeing the girl, the words of those days are becoming clear in front of her eyes.  Rimpa is not physically able, weak, anemia patient, Ranjan Babu doesn't give such pressure and money to his daughter, those who learn from Ranjan Babu, they are very hardworking, they eat ten times in the stadium, they do a lot of exercise, Rimpa can't work hard, but Rimpa  There is desire, there is devotion.  Rimpa is running and jumping on the sand, Ranjan Babu comes forward on foot

 _____ not happening, not happening, takeup should be done better, body should be lifted higher

 Not _____?  Or Dad?

 Will be _____

 Rimpa ran back to try again.

 Comes with concentration, jumps with take-up.  Ranjan Babu releases the measurement tape

 _____Subhas used to see how much -

 Subhash is a student of Ranjan Babu ... he learns from Ranjan Babu.  Subhash started measuring with measurement tape.

 ______Fourteen feet sir.

 It's good, sir.  Rimpa is doing much better than before.

 Ranjan Babu was happy in his mind.  Ranjan Babu's sick daughter.  I think this is a lot of effort.  Last year’s state level record was fifteen feet, a member of the Ranjan Babu Sports Association.  Earlier took the news.  Maybe a squeaky grain was forming in my mind and he removed it and told Subhash

 _____ How is your practice, you did a cool down exercise.

 ____Yes sir

 _____ And Prosenjit, Samar, they didn't come today, and only one week left.

 _____ Sir Samar and Rimpa are at the state level

 _____ There are club sports,

 At the district level, the competition was not very strong, Rimpa easily went to the state level, Samar is always good, Ranjan Babu already knew that he would reach the state level.  Summer event 100mtrs.  run.  But was it too easy for Rimper to come to the state level?  Swaraswati Naskar of Baruipur, Okara, how could he go to the top, so or what, Swaraswati could not give the last jump, she was fidgeting with chest pain, if she could give the last jump, what else, she gave five jumps  Babu's head is tingling, Rimper's illness is Rimper's obstruction, otherwise the girl's take-up style, what a beautiful mastery of the scissoring technique, Rimpa is very good.  Yes, only Ranjan Babu understands that maybe it will not be so straightforward, physical strength and need, but the girl must be encouraged, winning is not a big deal, even if you participate in the competition, the character is formed, he removed his thoughts and looked at the girl, in front of the bicycle.  Ranjan Babu is returning with his daughter

 _____ I understand mom, this is the golden time, and only one week, keep practicing well,

 _____ Dad, you're saying it's a golden time -

 _____ Yes, mother, you have to keep your performance.  Then no one will be able to stop you.

 Someone was selling orange lemons in front, Ranjan Babu made a bicycle, bought a lemon for his daughter, often on his way back from practice Ranjan Babu bought something for his daughter, Rimpa took out an orange lemon and put it in the mouth of a koya father.  Ranjan Babu's wife Bani was waiting for her daughter in front of the gate, Rimpa got down from the bicycle and hugged her mother.

 _____ Mom you know I jumped fourteen feet -

 Bani once looks at Ranjan Babu, then tells Rimpa

 ____ Got it, got it, but you have to do it all day, you have to sit down to study, class nine, next year secondary.  Go wash your hands and face well but sit down to read but -

 _____ No, I'm hungry. Let me eat

 I will wash my hands and face before giving _____

 _____ What food

 _____ milk

 As soon as he finished speaking, Rimpa burst into tears

 ____ No, I don't drink milk, milk smells

 ____ Ranjan Babu said in a caressing tone, if you say don't drink milk, competition is ahead!

 Rimpa goes inside.

 _____ Your darling girl is playing twelve.

 Ranjan Babu laughed hoho and said while lifting the bicycle on the verandah

 _____ just my caress ??

 It is true, Bani Devi, Ranjan Babu both love the girl very much, all dreams are arranged with the only girl.

 _________ I will go out with my daughter tomorrow morning, if you understand the message -

 _____ Why go where?

 _____ I will buy a good running shoe.

 ____ Do you think he can?

 ____ Why not, doing very well.

 Ranjan Babu said the words but a hesitation is working in his mind.  Bani can easily fall in love with Ranjan for so long.  However, not all the truth may be told, so the words and a little time to be silent, to turn things around

 ____When you come to Rimpa, wash your hands and face and let me eat.



 New running shoes, Rimpa is very happy, Ranjan Babu is also very happy, synthetic truck will have many advantages in this running shoe.  Ranjan Babu had been thinking for a long time that he would buy a good running shoe for his daughter. Last time there was a lot of difficulty in wearing the old running shoes.  Today I can't go to practice with my daughter anymore, it's been a long time, Ranjan Babu enters a good restaurant, goes out with his daughter, it's Ranjan Babu's habit, eat something.  He also packed it thinking about the message.  Ranjan Babu thinks that Bani is also very worried about his daughter. Two days ago, Rimpa went out with her uncle and became senseless on the street.  Bring it home.  Many doctors have shown that anemic from birth, there is nothing to do, the body can not make blood from food, the whole life needs to be taken care of a little more.  The girl thought she would win, more than happy to get new running shoes.  The waiter went through mutton korma and butter naan,

 _____ Dad, look, Mutton Korma has made it so beautiful,

 The food in this restaurant is very good, the message has come many times.

 ____ Yes, mother.  Very well made ...

 I am also packing for home.  Your mother is not Aslona.

 _____ What fun dad, I'll go home and eat.

 ____ Know what happened at Dad's school

 Rimpa begins to tell stories to school friends.  The story of father-daughter friendship never ends.



 Competition day

 From dawn to dusk, the message has been prepared for the girl, to go a long way, Salt Lake Stadium.  Subhash Samar Prosenjit They also came, took some food for everyone.  Ranjan Babu is also waking up the girl and giving the final trick to the rest.  Sports shoes, tracksuits are all arranged properly, the last minute message has to be taken care of, otherwise something will fall.

 From Bajaj to Salt Lake, a long way to reach is about 9:30.  The first event starts at ten.  Mike is going to hear his e-announcement again and again.  Ranjan Babu went to see his list exactly when the girl's competition.  Meanwhile, Bani is making the girl wear a tracksuit.  On the day of sports, Ranjan Babu forbids the girl to eat more, if she plays too much, her body will become heavy and she will not be able to jump well. Again, Bani thinks that her already sick daughter, if she does not play too much, turns her head so hard, Rimpa  I know what jogging is if his event starts first.  Bani is sitting in the corner of the field looking at the shadows, Prosenjit is giving Samar's breakfast in the morning, Bani is looking at Ranjan Babu coming here very soon, thinking that surely someone's event will start, such an event as you think,

 ______Ah Samar kheyona kheyona, body will become heavy, exercise, first under eighteen women 100mtrs, then your b ready.  Samar quickly left the food and got up,

 _____ I will eat later Aunty

 He went on to do light jogging.  Prosenjit and Subhash came along, they sat down as babu and started having breakfast.

 When is the _____ girl's event ??

 To the question of Bani, Ranjan Babu answered a little dead

 ____ The very last event.  The girl is sick!  His event is so late, let's feed him something now, but he can't eat

 _____ So either way, it will get weaker

 ______ No no the body will get heavier

 Ranjan Babu, a member of the Sports Association, a one-time national level champion, is here not only to bring the girl, but also as a volunteer.  So without wasting time, he turned his hand on the girl's head and left.

 Ranjan who looks very smart in a red blazer, Bani looks at him for a moment, smiles to himself and calls the girl.

 _____ Eat income, mother, your father will not let you eat later.

 Samar runs very well and wins.

 After feeding the girl and sitting on the balcony, Bani, Prosenjit, Subhash, Samar's event will start.  Rimpa also came along, so there is no busyness at the very end of his event.  The sound of revolver standing at Samar starting point, Prosenjit starts running, Subhash is shouting Samar, Samar ..... Samar is running first, but at the last moment Siliguri came out.  Samar II.  Ranjan Babu is saying something with his hand on Samar's back, Samar is watching the message from a distance, Samar is wiping his eyes, maybe this is what Ranjan Babu is saying to Samar.


 Ranjan Babu came to Bani on the field at around 4 pm and sat down. His mind seemed restless

 _____ What happened?

 _____ Here too is politics

 ______ means -

 ______ Remember Swaraswati Naskar?  Rimpa, who lost in district sports, has become a representative of another district,

 _____ But it is against the rules

 Tell _____ who will obey, and do you know who brought him?  Amal Kabiraj?  My opposition at the Sports Association.

 Bani says in a little silence

 _____ Why are you thinking?  If you want to win your daughter, you have to win by fighting with everyone. You know who Swaraswati is, so you wonder how many Swaraswati there are, and you know your daughter is sick,

 _____ Amal Kabiraj wants to lose you by losing your daughter ??  That's his concern, not yours.

 Neither Bani nor Ranjan Babu noticed when Rimpa came and stood behind him.

 ______ Dad I will try

 He ran towards the back of the long jump.  Match the number called one by one.

 The words of mother and father are floating on Rimper's head, can you do that?  He is really sick, can he keep his father's honor ???  The competition has begun.  One contestant after another is coming and going with their best, this time Rimper turn, Rimpa ran and jumped but the same, where is the takeup, where is the scissoring.  First the chance to jump three times, then the best six will get three more chances, the second jump, disqualify, Ranjan Babu is running once, running to the girl again, seeing how much he is jumping, the last jump of the first three jumps.  No, it's just that the girl will get three more chances, the volunteers are announcing their names based on the measurement of everyone's jump, Rimpa is sitting on the field, crying a lot, trying not to try.

 ______ No. 6 Rimpa ......

 Rimpa jumped up.  Starting again, one contestant after another is giving her best jump, Saraswati Naskar is still in the first place, Rimpa is just thinking that I can give her the best, Ranjan Babu is fidgeting, Bani is just looking at her daughter, the last three jumps Rimpa came with take up.  The scissoring technique of two legs in the air, Ranjan Babu has never seen a girl so beautiful before, I hope as if the grains are forming, the second jump, unprecedented  Urba, but still ahead of Saraswati, Ranjan Babu's daughter came forward, his eyes had never seen before in the language rimpa talks, watching the red blazers in the words of the teacher are progressing rimpara parents to give advice to his disciples,

 ________ last chance mom, otherwise everything will be blank in front ... last bite mom, last chance

 Rimper's name is called, Rimpa is running, Samar, Prosenjit, Subhash are all silent, Ranjan Babu is looking at his daughter with one glance, Bani is trying to realize the burden of Guru's disciple from a distance  , That scissoring technique in the air, as if running in the air, then jump ..............

 Volunteers are measuring with measurement tape, the crowd has gathered, volunteers are walking towards the office with measurements, no one is talking, new running shoes are taken off, Rimpa sports shoes are worn, now it is time to return.  Mike will tell the result now

 ____ The winners of today's women's under-15 long jump are being called to the base sand, the third Rama Maiti is the second Swaraswati Naskar, and the first to break the three-year record is Rimpa Dev with her record of 4.75mtr.  15 feet 7 inches.  At that moment, Ranjan Babu's eyes lit up with the joy of victory, Ranjan Babu hugged the girl with joy ... His sick daughter has won today,

 _____Bani My sick daughter has won.

 Tears welled up in the corners of Bani's eyes, he said with great difficulty

 ______ No more girls, the girl will get up at the base stand and take pictures ....

Friday, May 1, 2020

একটি ভৌতিক গল্প


একটি ভৌতিক গল্প
মিষ্টি দে


শৈলেন বহুদিন বাদে মাসির বাড়ি যাচ্ছে.  ট্রেন টা খালি হয়ে এসেছে,  দুই এক জন প্যাসেঞ্জার, বাকিরা সবাই আগের স্টেশন গুলোতে নেমে গেছে,  এই একটা মাত্রই ট্রেন এই স্টেশন অবধি আসে , নিঝুম গড়. রাত দশটা ট্রেন ঢোকবার সময়, এখন প্রায় পৌনে এগারোটা, যাক এসে তো পৌছালো. মাসির শরীরটা ভালো নেই, পোষ্ট অফিস  থেকে দুদিন আগে ফোন করেছিলো, মাসিকে নিয়ে যেতে আসতেই হোলো, মাসি একা মানুষ দেখা শোনার লোক নেই, আগে ছোটবেলায়  এসেছে,  শেষ আসে পাঁচ বছর আগে, রাতে এরকম আসেনি .  এইবার এতো রাতে আসতে হোলো,  কাজ মিটিয়ে বেরোতে একটু দেরি হয়ে গেছে, ফলে রাতের ট্রেনই ধরতে হোলো.
ষ্টেশনে নেমে আসে পাশে কাউকে দেখতে পায়না কোনো ভ্যান রিক্সা চোখে পড়ছে না,   এতো রাতে কোনো রিক্সা পাওয়ার আসা না করাই ভালো.  এই ভেবে হেঁটেই এগোতে লাগলো শৈলেন. প্রায় অনেকটাই পথ, মেঠো পথের ধার দিয়ে এগোতে থাকে, গ্রাম গঞ্জের ব্যাপার ইলেক্ট্রিসিটি থাকলেও বেশিরভাগ সময় লোডশেডিং থাকে. অন্ধকার গুটগুট করছে, দূরে জঙ্গলে জোনাকির আলো ঝিঁঝি পোকার ডাক,  বহুদিনের পরিচিত  রাস্তাকেও অপরিচিত করে তুলছে. দূরে একটা ভ্যান রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে, শৈলেন অন্ধকার ভেঙে একটু এগিয়ে এসে ই দেখতে পেলো হ্যাঁ ভ্যান রিক্সা ই তো, তবে কাউকে আসে পাশে দেখতে পাচ্ছে না.
____ কেউ আছেন?? কেউ আছেন নাকি???
_____ কে... 
বিদঘুটে গলায় "কে" বলে লোকটা এদিকেই তো এগিয়ে আসছে...
______ যাবেন নাকি???  পোস্ট অফিসের ধারে রমাবানিজ্যের বাড়ি যাবো. শৈলেন বলে ওঠে. মেসো মশাইয়ের এককালে খুব নাম ছিলো,  এদিকে ব্রাহ্মণ তারওপর জমিদার.
_____ কে শৈলেন খোকা??? 
ভ্যানের সামনে একটা থলে মতন কিছু ঝোলানো,  তার ভেতর থেকে একটা দেশলাই আর একটা কূপি বার করে জ্বালায়.
অন্ধকারে একটু আলোর দেখা পেয়ে শৈলেন ও যেন একটু নিশ্চিন্ত হয়.
_____ হ্যাঁ  আমি, কিন্তু আপনি চিনলেন কি করে?
_____ তুমি তো আগে প্রায় ই এইখানে আসতে
______ সেওতো প্রায় পাঁচ সাত বছর আগে
______ দেখো তো খোকা চিনতে পারো কিনা, কূপি টা মুখের সামনে তুলে ধরে
কাঁচা পাকা দাড়ি, গলায় গামছা, নোংরা মুখে ফোকলা হাসি, স্মৃতির ডাল পালা হাতরে মনে পড়ে, অজয় খুঁড়ো না ! আগে প্রায় ই মাসির বাড়ি আসলে ষ্টেশন থেকে ভ্যানে করে নিয়ে যেতো,  আবার ফেরবার সময় ষ্টেশনে পৌঁছে দিত .
______অজয় খুঁড়ো তুমি -
______ চিনতে পেরেছো তাহলে - বসো আর দেরি করেনা, রানীমা অপেক্ষা করছে.
গ্রামের সবাই মেসো কে রাজাবাবু আর মাসি কে রানীমা বলেই ডাকতো,  বাইরের পৃথিবী পাল্টে গেলেও গ্রামটা আগের মতোই আছে.
ষ্টেশনে বারোটার ঘন্টা পড়তে শোনা গেলো.
___ বসো শৈলেন খোকা
শৈলেন ভ্যানে উঠে বসে, অজয় খুঁড়ো ভ্যান টানতে শুরু করে, কিছুটা মাঠের ভেতর দিয়ে  তবে গ্রামের পথ, আধ ক্রোশ পথ হবে. কুপির আলোটা হাওয়ায় কাঁপছে. অজয় খুঁড়োর পা ভ্যানের চাকায় উঠছে আর নামছে নিস্তব্ধতা কে কাটাতে শৈলেন জিজ্ঞেস করে
_____ তোমার বাড়িতে  কে কে আছে গো খুঁড়ো
_____ তোমার খুড়ীমা অনেকদিন হোলো গত হয়েছেন আমার এক মেয়ে কে রানীমা আশ্রয় দিয়েছেন, ওর মা চলে যাবার পর থেকে  , সেও ----
কথা শেষ না  হতেই ভ্যানের চাকার তলায় বুঝি কোনো কুকুরের বাচ্চা এসে গিয়েছিলো কিঁউ মিউ শব্দে সরে গেলো.
___ আর কতো দূর খুঁড়ো
___ এই তো এসে গেছি
শৈলেন তাকিয়ে দেখে হ্যাঁ মাসির বাড়ির বাইরে বড়ো গেট, গেটের সামনে ভ্যান এসে দাঁড়িয়েছে.  শৈলেন নেমে অজয় খুঁড়ো কে পকেট থেকে টাকা বার করে দিতে যায়,
খুঁড়ো ফোকলা হাসি দিয়ে
____ লাগবে না,  রানীমা দে দেছেন.
বলেই ভ্যান নিয়ে চলে যেতে লাগে.
____ শোনো খুঁড়ো কাল সকালে স্টেশন যাবো..
খুঁড়ো উত্তর দেয়না.  অন্ধকারে হারিয়ে যায়.  কুপির আলোটাও মিলিয়ে যায়.  লোডশেডিং তাই বলে মাসি একটাও আলো  জ্বালাবেনা এ কেমন কথা?   অন্ধকারের ও একটা আলো থাকে, সেই আলোতেই গেট খুলে ভেতরে ঢোকে শৈলেন.
___ মাসি ও মাসি আমি শৈলেন
আরো একটু এগিয়ে যায়,  পাঁচ বছর আগে শেষ  যখন এসেছিলো,  কত জমজমাট থাকতো, মেসো তখন ও বেঁচে,  বছর দুয়েক হোলো মেসো মারা গেছে. গ্রামটার কোনো উন্নতি হয়নি মাসির কাছে ফোনে খবর পেতো. কতবার মাসিকে বলেছে গ্রামের বাড়ি বিক্রি করে শহরে চলে আসবার জন্য.  মাসির নিজের কোনো সন্তান নেই, ফোন বলতে সেই পোস্ট অফিসের ফোন. মাঝে মাঝে ফোনে বলেছে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে যাবেনা,  মাসির কাছে শুনেছিলো একবার খুঁড়োর মেয়ের কথা.  প্রায় মাস তিনেক আগে বৃষ্টির সময় মাসি একবার ফোন করেছিলো বৃষ্টির সময়,  বন্যার আশঙ্কা ছিলো, সবাই গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলো, মাসি বলেছিলো গ্রাম ছেড়ে সে যাবে না,  কতবার শৈলেনের মা বাবাও বলেছে শোনেনি.
____ আপনি শৈলেন দা
পাশের থেকে এক মেয়ের গলা পেয়ে ঘুরতেই
_____ মাসি বলছিলো আপনার আসবার সময় হয়ে গেছে. আসুন এইদিকে আস্তে  ভাঙা চোরা সিঁড়ি,  বন্যার সময় জল ঢুকে নিচের তলার সবটাই নষ্ট হয়ে গেছে.
শৈলেন মনে মনে ভাবছে এই বুঝি সেই খুঁড়োর মেয়ে,
_____ আমি মালা-
_____অজয় খুঁড়োর মেয়ে??
_____ হ্যাঁ
লণ্ঠনের আলোয় মেয়েটার মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না এতো অন্ধকার চারিপাশে.
____ আলো আসবেনা. একবার গেলে দুই তিন দিনের মধ্যে দেখা নেই.
শৈলেন একটু অবাক হয়,  মেয়েটাকি মন পরতে পারে,  যে কথাই ভাবছে, তার ই উত্তর দিয়ে দিচ্ছে.
_____ মাসি মাসি,  শৈলেন দাদাবাবু এসেছে -
ওপর তলায় মাসির ঘর ছিলো,  এঘর শৈলেনের চেনা,  ছোটবেলায় কত এসেছে
_____ শৈলেন এসেছিস বাবা
_____ মাসির গলার আওয়াজে  দক্ষিণের বারান্দার দিকে তাকায়,  মাসির ঘরের লাগোয়া এই বারান্দা,  আগেও মাসি অবসর সময়ে বারান্দায় বসে থাকতো.
অন্ধকারে মাসির মুখটাও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেনা.  তবু গলার স্বর,  শাড়ি পড়বার ধরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে এই তার সোনা মাসি.  এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করতে যায়,  মাসি বাঁধা দিয়ে বলে,  মেলা রাত হয়েছে, হাত মুখ ধুয়ে এসে খাবার খেয়ে নে. সেই কখন বেরিয়েছিস. তারপর তোকে একটা জিনিস দেবো.
____ কি জিনিস
____ এ বাড়ির দলিল,  পুরোনো গয়না, একশো বছরের পুরোনো,  এ পরিবারের সাত কূলে কেউ তো নেই তাই সব তোকেই দিয়ে যাবো, আমি আর কতদিন আগলে রাখবো বল -
____ সে কাল দেখা যাবে.  তোমাকে আমি এবার নিয়েই তবে যাবো.
হাত মুখ ধুয়ে এসে খেতে বসে শৈলেন,  মাসি আজ ও মনে রেখেছে তার পছন্দের সব খাবার.  খেয়েদেয়ে এবার একটু শুয়ে ঘুমিয়ে নেবে ভাবছে,  অজয় কাকা কে না বললেই হতো ভোরের ট্রেন ধরবে,  আসলে জানিয়ে দেবে,  যাবেনা.  একদিন থেকে তারপর ফিরবে.
_____ কিরে শুয়ে পড়েছিস
মাসির ঘরেই গা এলিয়ে দিয়েছে, এই ঘরেই একটু আলো,  এতো বড়ো জমিদার বাড়ি, অন্ধকারে ভুতুড়ে বাড়ি লাগছে.
____ হ্যাঁ মাসি কোথায় শোয়ার ব্যবস্থা করেছো আমার, অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হচ্ছে না
_____ এখন শুয়ে কি করবি,  তোর জিনিস গুলো আগে সামলা, -
_____ কাল দেখবো
______ না এখন ই
অগত্যা,  ইচ্ছা না থাকলেও সায় দিতে হোলো কোই দেখাও
____ তোর ব্যাগে এগুলো ঢুকিয়ে নে-
অন্ধকারে তেমন কিছু  পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না, মনে হোলো দলিল জাতীয় কাগজ পত্র, আর একটা পুরোনো গয়নার বাক্স.  ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয় শৈলেন,
____ এগুলো কাল দিলে হতো না, আর তুমি এবার আমার সাথে যাবে.
কথাটা বলে আদরে জড়িয়ে ধরতে গিয়েই কেমন হাত পা ঠান্ডা হয়ে ঝট করে সরে এসে পাশে রাখা হেরিকেন টা সামনে নিয়ে এসে ধরলো ভয়ে আঁতকে উঠলো শৈলেন,  এ কি দেখছে কঙ্কালের গায়ে শাড়ি পেঁচানো,  ভয়ে হাত থেকে হেরিকেন টা পড়ে এদিক ওদিক তেল ছিটকে আগুন জ্বলছে, কঙ্কাল চেহারা র নির্লিপ্ত চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে,
____বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে, আমি প্রাণে বেঁচে ছিলাম, কিন্তু জল নামার সাথে সাথে রোগে ধরলো পুরো গ্রাম শেষ হয়ে গেলো, বাড়িটার ওপর নজর আছে পাশের গ্রামের পঞ্চায়েতের তাই সব তোর নামে করেই রেখেছিলাম দিয়ে গেলাম. আমিও বেঁচে নেই রে বাবু.
শোনা মাত্রই দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো শৈলেন
___ আস্তে ভাঙা আছে
অজয় খুঁড়োর মেয়ের কথায় ঘুরে দাঁড়ায় শৈলেন কাছে এগিয়ে জিজ্ঞেস করে
____ আমার মাসি
আর কিছু বলতে পারেনা
_____ আমার হাত টা ধরো দাদাবাবু অন্ধকারে পড়ে যাবে
কেমন যেন ঘোরের মধ্যেই  হাত টা ধরে,  বরফের মতো ঠান্ডা, এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে  সিঁড়ি দিয়ে ছুটতে ছুটতে নেমে এসে গেট দিয়ে বেরিয়ে আসে, অজয় খুঁড়ো  ভ্যান রিক্সা নিয়ে দাঁড়িয়ে ই আছে
____ খুঁড়ো স্টেশন চলো
খুঁড়ো ও ছুটতে থাকে রিক্সা নিয়ে. সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে অন্ধকার মাঠ ঘাট পেরিয়ে খুঁড়োর রিক্সা স্টেশনের মুখে এসে দাঁড়ায় শৈলেন নেমে স্টেশনের দিকে এগোতে থাকে, 
___ খোকা বাবু
___ খুঁড়োর ডাকে শৈলেন ফিরে তাকায়
মনে ভাবে খুঁড়ো কে টাকা দেবে কি করে সব কিছু তো মাসির বাড়িতেই ফেলে এসেছে.
____ তোমার ব্যাগ
ভ্যান থেকে শৈলেনের ব্যাগ টা নামিয়ে দেয়
শৈলেন ভাবে ব্যাগ টা তো সে ফেলে এসেছিলো.  শৈলেন কিছু বলতে পারেনা. মাথা ঘুরছে. 
লোকজনের কথা বার্তা শুনতে পাচ্ছে, চোখ খুলতেই দেখে তাকে ঘিরে রয়েছে বেশ কয়েকজন সকালের আলো ফুটেছে.
____ কি মশাই এখন ভালো লাগছে???
ট্রেন ঢুকছে আপনি যাবেন??
____ শৈলেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়.
ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে শৈলেন এগোতে যায়
_____ ও মশাই ব্যাগ নিয়ে যান.
শৈলেন ব্যাগ টা নিয়ে  ট্রেনে উঠে বসে,  বিশ্বাস হচ্ছে না কিছু ই, ব্যাগ টা খোলে নিজের জামা কাপড় ছাড়া কিছুই তো নেই.  তাহলে পুরোটাই কি স্বপ্ন দেখছিলো মাসির বাড়ি কি পৌঁছাতে পারেনি,  ট্রেন চলতে লেগেছে ততক্ষনে,  ব্যাগের সামনের খাপে সিগরেট আছে বার করবার জন্য চেন খুলে হাত দিতেই চমকে ওঠে, ভালো করে দেখতেই চোখে পড়ে দলিল, শক্ত মতো কি যেন  হাতে বাঁধছে, একি সেই গয়নার বাক্স....


Wednesday, April 29, 2020

জীবনে ভাগ্যের খেলা


জীবনে ভাগ্যের খেলা
মিষ্টি দে

যত সময় এগোচ্ছে সুদেষ্ণা যেন বুঝতে পারছে জীবনের সমস্ত ঘটনা, প্রকৃতির প্রতি মুহূর্তের পরিবর্তন ভাগ্যের খেলা ছাড়া কিছুই না.  লকডাউনের ঠিক আগের দিন হেঁদো গ্রামের এই বাড়িতে এসে আটকে পড়েছে,  সেই থেকে কপালে কষাঘাত করছে, কি অলক্ষনে যে এসেছিলো, বাড়িতে থাকলে কি সুখেই না থাকতে পারতো.  লকডাউনে অফিসেও যেতে  হতোনা,  বিন্দাস ছুটি কাটানো যেতো. 
গ্রামের এই বাড়িটা সুদেষ্ণার শশুরের ভিটে,  সুদেষ্ণার স্বামীরা চার ভাই, সুদেষ্ণার স্বামী বিয়ের এক মাসের মধ্যেই গত হয়েছিলেন.  কলকাতায় সরকারি অফিসে চাকরি করতেন,  সেখানেই মেসে থাকতেন,  বিয়ের পরে আলাদা ঘর নেওয়ার কথা ছিলো, সে সময় বিধাতা দেননি.  সুদেষ্ণা চাইলে স্বামীর চাকরি অনায়াসেই পেতে পারতো, কিন্তু সে চায়নি,  মনে মনে ভেবেছিলো যে স্বামীর সাথে একদিনের সংসার করা হলোনা তার চাকরিতে ও কোনো অধিকার নেই তার. অ্যানিমেশন নিয়ে পড়াশোনা করেছে সুদেষ্ণা. সেই বিষয়ক চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিলো অল্প কিছুদিনের মধ্যে. বিয়ের একমাসের মধ্যে স্বামীর মৃত্যু, শ্বশুর বাড়ির লোকজন যে ভালো চোখে দেখবে না সেটাই স্বাভাবিক. 
সুদেষ্ণার স্বামীর অংশটুকুও এরকম অপয়া বৌ কে দিতে চায়নি, কিন্তু সুদেষ্ণার কাকা জাঁদরেল উকিল সুদেষ্ণা র স্বামীর অংশটা আদায় করে ছেড়েছে,  সেই অংশেই ভাড়া বসানো,  দুই তিন মাস অন্তর সুদেষ্ণা আসে,  দেখাশোনা করে ভাড়া নিয়ে চলে যায়,  তবে সে টাকা নিজের জন্য খরচ করেনা একেক বার একেক আশ্রমে দান করে দেয়,  সুদেষ্ণা ভাবে যে বিয়েটা কোনো বিয়েই নয় তার টাকা নিজের জন্য কি করে খরচ করবে সে !  সুদেষ্ণা তো বিয়েটাই করতে চায়নি.  কিন্তু ওইযে ভাগ্যের খেলা, সুদেষ্ণার জীবনটাকে তছনছ করে দিয়েছিলো. মাঝে মাঝে কাকার ওপরই রাগ হয়. 
সুদেষ্ণার বাবারা দুই ভাই, সুদেষ্ণার বাবার নাম ছিলো মোহন, আর কাকার নাম মদন.  সুদেষ্ণা র বাবা প্রায় ই বলতো আমরা দুজন হর হরি আত্মা.  কথাটা মিথ্যা ছিলোনা.  দুই ভাই এর খুব মিল ছিলো.  এই মিলই সুদেষ্ণার জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছে, মাঝে মাঝে স্মৃতি গুলো কেমন পরিষ্কার হয়ে ওঠে,  সুদেষ্ণার বাবার ক্যান্সার ধরা পরে, শেষ অবস্থা,  কিছুই করবার নেই,  অসহায় পিতার পিতৃ স্নেহ কাতর হয়ে উঠেছিলো,  মেয়েটার বিয়েও দিতে পারলোনা,  সুদেষ্ণার তখন কত আর বয়েস কুড়ি  পেরিয়ে একুশে পড়বে. কাকাই  তখন বিয়ের সম্বন্ধ টা নিয়ে এসেছিলো, ছোটো সুদেষ্ণার আপত্তি  বা মতামত কোনো কিছুরই গুরুত্ব ছিলোনা সেদিন. বাবার মুখের দিকে চেয়ে কিছু বলতে পারেনি সেদিন.  অরুনের কথাটাও না. বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো আজ প্রায় পনেরো বছর বাদে ও অরুনের মুখটা সুদেষ্ণার অনুভূতি গুলোকে নাড়িয়ে দেয়.  অরুন তখন মেডিকেল কলেজের শেষ বছরের ছাত্র.  উজ্জ্বল ভবিষ্যত. সুদেষ্ণা কে গ্রহণ করে নিতে পারতো কি???  ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিলো সুদেষ্ণা তবু অরুনকে কিছুই বলতে পারেনি.  অরুন তখন দিল্লী, সুদেষ্ণার বিয়ে হয়ে যায়,  সপ্তাহ খানেকের মধ্যে জীবনটাই পাল্টে গিয়েছিলো. ফুল শয্যার রাতে স্বামী শোভনকে অরুনের কথা বলতে দ্বিধা করেনি সুদেষ্ণা, কোনো মিথ্যা দিয়ে সে নতুন জীবন শুরু করতে চায়নি.  পরের দিন সকাল বেলা শোভন কলকাতায় ফিরে গিয়েছিলো,  আর ফেরেনি. অফিস থেকে ফেরবার সময় পথ দুর্ঘটনায়....
এসব সুদেষ্ণা মনে করতে চায়না. মনে মনে ভাবে শোভনের মৃত্যুর জন্য  সেকি দায়ী???  মিথ্যে নিয়ে শুরু করতে চায়নি সে.  ভাগ্য তাকে নিয়ে সবসময় খেলা করেছে. অরুনের সাথে কাটানো সময়গুলো আজও মনে পড়লে ভালো লাগে সুদেষ্ণার,  কেমন একটা ভালো লাগা ছিলো,  সুদেষ্ণা ভাবে বুটাইদার সাথে দেখা করতে প্রায়ই আসতো অরুন.  বুটাই কাকার ছেলে,  সুদেষ্ণার অনেক বড়ো. সুদেষ্ণা তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে. বুটাইদা আর অরুন একই সাথে পড়াশোনা করতো. উঁচু লম্বা,  শ্যামলা গড়ন, বড়ো বড়ো চোখ অরুনকে বেশ লাগতো সুদেষ্ণার,  এখন ভাবে হয়তো অল্প বয়েসের ভালোলাগা. দূর্গা পুজোর সময়, বাড়ির পিছনের লাগোয়া বারান্দায় তখন খুব একটা কেউ যেতনা,  সামনের দালানে পুজোর জায়গাতেই সবাই থাকতো,  সুদেষ্ণার  আজ সেই কথাগুলো খুব মনে পড়ছে , সেদিন ছিলো দূর্গা ষষ্টি,  পাড়ার একটা ছোটো মেয়ে এসে বলেছিলো পিছনের দালানে বুটাই দা ডাকছে. সুদেষ্ণা পিছনের দালানে এসে কাউকে কোথায় দেখতে পায়নি,  ফিরে যাবার সময়, 
_____ কি হোলো চলে যাচ্ছ???
_____একি অরুণদা তুমি আমায় এখানে ডাকলে কেন? মুহূর্তে বুকের ভেতর টা যেন শুকিয়ে গিয়েছিলো,  সেটা কি ভয়, লজ্জা,  আজও জানে না সুদেষ্ণা.
_____ কি ভাবছো সুদেষ্ণা? অমন চুপি চুপি আমাকে দেখো কেন বলোতো???
কথাটা শোনা মাত্রই সারা বিশ্বের লজ্জা যেন গ্রাস করেছিলো, সুদেষ্ণা পালিয়ে যেতেই চেয়েছিলো,  সুদেষ্ণাকে পালতে দেয়নি অরুন, কাছে টেনে ঠোঁট দুটোকে জ্বালিয়ে দিয়েছিলো.....
পুরোনো স্মৃতি থেকে মালতি র ডাকে ফিরে আসে সুদেষ্ণা. 
_____ দিদি তোমার রান্না করে দিয়েছি,  টেবিলে ঢাকা দেওয়া আছে. জ্বর টা কি কমেছে?
______ ওই একরকম
______ তোমাকে বললাম আশ্রম এর সাধু বাবার কাছ থেকে ওষুধ এনে দি, শুনলে না.  গ্রামে উনি আমাদের ভগবান.
উত্তর দেয়না সুদেষ্ণা.
_____ আসছি দিদি কাল সকালে আসবো. সুদেষ্ণা এখানে আসলে মালতি ই দেখাশোনা করে.
মালতি সুদেষ্ণার খুব খেয়াল রাখে, কাল ই বলছিলো "কি গো দিদি তুমি এতো সুন্দর দেখতে, যখন প্রথম বৌ হয়ে এসেছিলে, কি মিষ্টি লাগছিলো,  অযত্নে কি অবস্থা করেছো নিজের,  অল্প বয়েসে তোমার স্বামী চলে গেছে, এতে তোমার কি দোষ !
শোভন এর জন্য না নিয়তির নিষ্ঠুর আঘাতের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ.. আবার সুদেষ্ণা পুরোনো স্মৃতিতে ডুবে যায়, সে ভাবতে  থাকে... অরুণ অল্প দিনেই সুদেষ্ণার  মনের গভীরে জায়গা করে নিচ্ছিলো,  সুদেষ্ণা মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলো. টুবাইদার কাছে শুনেছিলো মিলিটারি ডক্টর হয়েছে অরুন.  তারপর হটাৎ ই হারিয়ে যায়, পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি দুর্ঘটনায়...  অরুন ও চলে গিয়েছিলো,  অরুন দিল্লী যাবার আগে সুদেষ্ণা কে বলেছিলো
___ সুদু আমার জন্য অপেক্ষা করবে তো,  দিল্লী থেকে ফিরে আর মাত্র  এক বছর, তারপর তোমাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবো...  মা বাবা আমার নেই, জানোই তো,  বছর দুয়েক হোলো তারা পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন,  তুমি ই আমার সব,  দুই হাতে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিয়েছিলো,
______ সুদেষ্ণা কথা রাখতে পারেনি,  এক বছর কেন,  তার বাবার কাছে যে একটুও সময় ছিলোনা, শোভনের মৃত্যু সংবাদ তার বাবাকে আর বাঁচাতে পারেনি.
জ্বর টা বাড়ছে মনে হচ্ছে, লকডাউনের সময় তাও আবার এই হেঁদো গ্রামে ডাক্তার পাবে কোথায় ! লকডাউন কাল শেষ হয়ে যাবে, শহরে ফিরেই ডাক্তার দেখাতে পারে,  কিন্তু যদি বাড়াবাড়ি হয়, কাল কি একবার সেই সাধুবাবার ওষুধ আনতে বলবে,  ধুর কি সব আজে বাজে ওষুধ দেবে,  না একবার চোখে দেখে এলে কেমন হয়, মোবাইল টা বার করে মালতি কে ফোন লাগায়
____মালতি বাড়ি চলে গেছিস,
____ না দিদি
____ একবার আশ্রমে নিয়ে যাবি, তোদের সাধুবাবার কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে আসি,
ওদিক থেকে মালতি বলে ওঠে
____ না দিদি আমি একাই নিয়ে আসছি, তুমি কষ্ট করবে কেন?
____ নারে মালতি আমি একটু যাবো, 
____ আচ্ছা দিদি আমি আসছি.
সুদেষ্ণা ভাবে এবারের ভাড়ার টাকাটা এই আশ্রমেই দিয়ে যাবে.  এক ই তো ব্যাপার.
পায়ে হাঁটা পথ, গ্রামের দক্ষিণ দিকের পুরোনো মন্দির.  মালতি আসতে আসতে সাধুবাবার গল্প বলতে লাগে. 
___ দিদি এই মন্দিরে খুব একটা পুজো অর্চনা হতোনা.  এই বছর কয়েক হোলো কোথা থেকে এই সাধুবাবা এসেছে সাক্ষাৎ ভগবান.  মন্দির টা কি সুন্দর গুছিয়ে নিয়েছে,  গ্রামের ছেলে মেয়েদের পড়াশোনা শেখায়,  কেউ অসুস্থ হলে ওষুধ দেয়,  শহর তো মেলা দূর. সাধুবাবা সাক্ষাৎ ভগবান. 
সুদেষ্ণা মালতির কথা শুনতে শুনতে মন্দিরের কাছে এসে উপস্থিত হয়,  ঠিকই বলেছে মালতি কত ফুলের গাছ, হ্যাঁ বেশ সাজিয়েছেন,  এতো দিন এখানে এসেছে কোনদিন এদিকটায় আসা হয়নি, আসতেও চায়নি.  মালতি ছুটে আশ্রমে সাধুবাবার ঘরের দিকে চলে গেছে, এখন লকডাউনের জন্য  সাধুবাবাও ছেলেদের পড়ায় না, মালতির কাছেই শুনছিলো.
কালকে ফিরে যাবে কলকাতা শরীর টা সায় দিলে হয়.  
______দিদি সাধুবাবা ডাকছে তুমি যাও, আমি ঠাকুরের কাছে মাথা ঠুকে আসছি.
ওইযে সাধুবাবার ঘর, তোমার কথা বলেছি.
সুদেষ্ণা সন্যাসীর ঘরের দিকে এগোয়. ঘরের সামনে এসে দেখে সন্যাসী পিছন ঘুরে বই ঘাঁটছে, সুদেষ্ণার পায়ের শব্দে সন্যাসী বলে ওঠে
____আসুন কি হয়েছে আপনার -
মুহূর্তে সুদেষ্ণার রক্ত যেন হিম হয়ে গেলো,  এ কণ্ঠস্বর তার তো খুব চেনা
____ কি হোলো আসুন
বলেই সন্যাসী ঘুরে তাকালেন সুদেষ্ণার দিকে.
সুদেষ্ণা আরো চমকে গেলো,  কি দেখছে সে, কাকে দেখছে,  সময়ের স্রোতে যেটুকু পরিবর্তন হয়, সেই সুঠাম চেহারা, আবেগ ভরা দৃষ্টি. এই দৃষ্টি তো সুদেষ্ণা ভুলতে পারেনা. অরুন, বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে, কতদিনের চাপা দুঃখ আজ যেন বাঁধ ভেঙে ফেলতে চাইছে, ছুটে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে, পারছেনা,  হাজার প্রশ্ন, প্রশ্ন হয়ে পাগল করে দিচ্ছে, অসুস্থ শরীর বোধহয় আর নিতেও পারছেনা চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসছে,  অরুন কি আবার হারিয়ে যাবে, সুদেষ্ণা আর দাঁড়াতে পারছেনা, অরুন সুদেষ্ণা কে ধরে পাশের চৌকিতে বসিয়ে দেয়,
_____ এ কি অবস্থা করেছো সুদু
সুদেষ্ণা লজ্জা পেয়ে যায়, আজ ই মালতি বলছিলো অযত্নে তার চেহারা আর নেই, নিজেকে সামলে নিয়ে বলে
_____ তুমিও তো
_____ সে তো তোমার ই দান সুদু
_____ বিশ্বাস করো
_____ জানি তুমি নিরুপায় ছিলে কাকা বাবুর অসুস্থতা
_____ তুমি ফিরে এসেও কোনো যোগাযোগ করোনি কেন?
______ তোমার সুখের সংসারে
______ আমার সংসার তো একদিনের
______ হুম মালতির কাছে শুনেছি,  ও ওর মার জন্য ওষুধ নিতে মাঝে মাঝে আসে, শুধু বুঝতে পারিনি ওর দিদিমনি আর কেউ নয় তুমি..
সুদেষ্ণার চিন্তা শক্তিও যেন স্থির হয়ে গেছে.  একটা প্রশ্ন ই মনে উঠে আসছে - আজ আবার এ কোন ভাগ্যের খেলা জীবন তাদের সামনে নিয়ে এসেছে.......