ফেরা
মিষ্টি দে
রাতের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে সশব্দে ছুটে চলেছে বম্বে মেল, মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ হুইসল
কাদের সতর্ক করছে, অনিমা ছুটন্ত কামরার খোলা জানালায় তাকিয়ে থেকেও কিছু বুঝতে
পারছেনা, আসলে কিছু বুঝতে চাইছেওনা। মনটাই কেমন যেন সব চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে একেবারে
ফাঁকা হয়ে গেছে। অনিমা ফিরে চলেছে তাঁর কর্মস্থলের পথে। পাশে শুয়ে
আছে তিন বছরের মেয়ে নিতু, তার মুখের দিকে তাকাতেও যেন মা অনিমা কোনও আগ্রহ খুঁজে
পাচ্ছেনা, হাহাকার সাড়া মনটা জুরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
আকাশ এত বড় কথাটা বলতে
পারবে সেটা অনিমা স্বপ্নেও ভাবেনি। কি ভয়ঙ্কর শব্দের চাবুক, হু হু করে কান্না ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে।
দ্রুত খোলা জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো, পাছে আশে পাশের যাত্রীদের নজরে পরে যায়,
অবশ্য সেটা না করলেও চলত, কারণ খুব কম
যাত্রীই জেগে আছে। তবু অনিমার মনে হল জগতের সব লজ্জা, সব অপমান বুঝি তার জন্যই ওঁত
পেতে বসে আছে।
-----আকাশ আকাশ তুমি
একি করলে! তোমাকে অবলম্বন করেই তো যাত্রা শুরু করেছিলাম, তোমার কত প্রতিশ্রুতি-
আঃ! নরম ঘায়ের জায়গাটায় কে যেন নির্মম ভাবে খুঁচিয়ে দিল-
আকাশ এই প্রতিশ্রুতি
কথাটা বলেই শেষ শব্দ অস্ত্রটা অনিমার নরম বুকের গোপন হৃৎপিণ্ডটাতে অনায়াসে ঢুকিয়ে
দিয়েছিল। হ্যাঁ বিয়ের আগে একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অনিমা, আকাশ এখনো বেকার, অতএব
বিয়ে করতে চায়নি সে এই মুহূর্তে, অনিমা বলেছিল, সে তো চাকরি করে , সংসারে একজন
টাকা উপায় করলেই হবে, অনিমা বলেছিল চাকরি বা টাকা কোনটাই তাদের সম্পর্কের মাঝে এসে
দাঁড়াবে না। কিন্তু না- না- হয়না, আকাশের অর্থ রোজগার, আর অনিমার চাকরীর টাকা
দুটোর মধ্যে আসমান জমিন ফারাক, অন্তত আকাশ তাই মনে করে, তাই হাজার প্রতিশ্রুতি
রাখলেও সব ভুয়ো হয়ে গিয়েছিল মুহূর্তে। কিন্তু কেন? আকাশকে সারাদিন নিতুর কাছে
থাকতে হয় বলে, গভর্নেস রাখবার কথাও অনিমা বহুবার বলেছে, আকাশ রাজী হয়নি, আকাশ
চাকরী করলে তাকেও তো তাই করতে হতো, তবে তার বেলায় সেটা অপরাধের হবে কেন? পুরুষের
পৌরুষে আঘাত লাগছে বলে? সামাজিক এই অন্যায়, অকথিত এই নির্দেশ অনিমা মানবে কেন?
কিন্তু আকাশ মানল, তাকে হেনস্থা করলো, যা নয় তাই বলে অপমান করলো, তাই সে এলোনা,
শুধু এলোনা বললে ভুল হবে, নির্মম ভাবে আঘাত
করতেও ছাড়ল না। একটু ভালো ব্যবহার
করতে পারত নাকি! অমন রূঢ় আচরণ না করে
একটু স্বাভাবিক, না হয় একটু তোয়াজই করত। তাহলেই তো অনিমা গলে যেত। আকাশ তা করলো
না, কেন করলো না, সে কি ফেলনা?
সরকারী অফিসে অফিসার গ্রেডে চাকরী করে, সুন্দর কোয়ার্টার, সুস্থ জীবন যাপন,
আকাশের সেটা পছন্দ নয়, ওতে নাকি ওর মানহানি হচ্ছে, রোগের ছলনাটা কি লোক দেখানো নয়?
ডাক্তার নাকি বলেছে খুব খারাপ কন্ডিশন, এখন কোথাও যাওয়া চলবে না। কথাটা যে ডাহা
মিথ্যা, সেটা অনিমা কি বুঝতে পারছে না, পারছে, তবুও মিষ্টি ব্যবহার নিয়েই তো শুরু
করেছিল, এতকাল পরে মেয়েকে নিয়ে, প্রায় এক বছর তো বটেই, অনিমা ভাবছে- এতদিন
পরে নিতুকে পেয়ে যে আকাশ সন্তুষ্ট হয়েছে, সে তো তার চোখে মুখেই ফুটে উঠেছিল, কেমন
জ্বল জ্বল করে হেসে উঠেছিল দৃষ্টি, সেটা দেখেই অনিমা ভুল টা করে বসলো, আর সেই
প্রথম ভুলটাই সর্বনাশটা টেনে আনল।
আহা বেচারা- অনিমার নিজের ওপরেই কেমন রাগ হচ্ছে, কেন অমন
করে বসল অনিমা? আকাশের সেই মুহূর্তের
চেহারাটা বারবার অনিমার বুকের মধ্যে ঝড় তুলছে। কেমন এক নিমেষে খুশির সমুদ্র শুকিয়ে, মরুভূমির
দাবদাহ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। আকাশ ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল অনিমার চোখের সামনে, অনিমার
ইচ্ছে হচ্ছিল,দুই হাতে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে আকাশের সব ব্যথা মুছে দিতে। কতকাল- কতকাল ওর ওই পৌরুষ
ভরা চিবুকের স্বাদ অনিমার উপোষী বক্ষ স্পন্দন অনুভব করেনি, যার তাড়নায় পাগলের মত
ছুটে এসেছে সুদূর বিলাসপুর থেকে, কলকাতার এই জীর্ণ বাড়িতে। কিন্তু হায়! সেতো হলোনা।
অনিমার কিছুই করা হলোনা। অধিকন্তু মুখ যেন আরও মুখর হয়ে, আরো ভয়ঙ্কর কশাঘাত করে
বসল, “ভাত দেওয়ার গতর নেই কিল মারার গোঁসাই!” কোথায়
কবে কেমন করে যে এই প্রবচনটা শিখেছিল, আর শিখলেই এক্ষুনি ওটা বলবার প্রয়োজন পরল, ----
ছিঃ ছিঃ সত্যি অন্যায় করেছিল সে। আর ঐ দিয়ে শুরু করেই আর থামতে পারেনি অনিমা, একের
পর এক শব্দের ঝংকার, একের পর এক লড়াকু অসির কথা মনে করিয়ে অনিমাকে একেবারে চরম
শিখরে তুলে দিচ্ছিল, আর থামা সম্ভব হয়নি--। অনিমা ভাবে, আকাশ কি খুব অন্যায় কিছু বলেছিল?
সেওতো কম যায়নি, চাকরীটা অনিমার নাকি বাহানা, ভ্রষ্টাচারের পাসপোর্ট, অনিমার
প্রতি মাসের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা মাইনের টাকা, নাকি আকাশ কে সোনার চাবুক মারবার
কায়দা বিশেষ। আরও কত সব ন্যক্কারজনক
কথাবার্তা। তাই অনিমার পক্ষে সামলান সম্ভব হয়নি। প্রলয়ের মহা ডঙ্কা বাজিয়ে সব ভেঙে
গুঁড়িয়ে দিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এমন করে বেড়িয়ে এসেও এখন শান্তি পাচ্ছে না।
আকাশের শেষ বেলাকার মুখটা বার বার কেন জেগে উঠছে মনে, বারবার মনে হচ্ছে আকাশের শেষ
বেলাকার আকুতি কি বেদনার্ত ছিল-। না – আকাশ কে ছেরে সে থাকতে পারবে না,
কিন্তু যে ব্যবহার করে সে ঐ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছে, তারপরে আর তো তার ফেরা সম্ভব নয়, কিন্তু তাই বলে সব শেষ হয়ে যাবে! নিতু- তার
মেয়ের ভবিষ্যৎ! নিজের জীবনের বাকি আরও চল্লিশ, পঞ্চাশ বছর- , না না একা থাকা
যায়না, এই দুনিয়ায় অর্থই সব নয়। গত এক বছর ধরে তিল তিল করে অনুভব করেছে অনিমা, চাই
আকাশ কে তার চাই, তাই তো সে ছুটে গিয়েছিল আকাশ কে ফিরিয়ে আনতে, কিন্তু কোথা দিয়ে
কি যে হয়ে গেল। আকাশের শেষ সময়ের আকুতি ভরা দৃষ্টি টা এখনো গায়ে শিহরণ তুলছে
অনিমার। রোগে ভুগছে, তাই বাবা মায়ের কাছে আছে, সেও নিজের ইচ্ছায়, তবু অমন আকুতি
কেন ছিল চোখে মুখে?—
-
নিতুর
জন্য কি? মেয়ের জন্য সব বাবার ই এমন হয়। কিন্তু না-তার থেকেও আরও কিছু বেশি একটা।
না - না নিতু নয়- অনিমা অনিমাকেই চাইছিল আকাশ। আকাশ- আমার আকাশ। বুকটা ঠেলে কান্না
আসছে, চোখে মুখে হাহাকার ঝাঁপিয়ে পড়ছে। - আকাশ তোমায় আমি ভালোবাসি, বিশ্বাস করো
তোমাকে ছাড়া এ জগতে আমি একা চলতে পারব না। দাঁরাও, দাঁরাও আমি আসছি, আমি ফিরে
আসছি, মন ঠিক করে ফেলে অনিমা, সামনের ষ্টেশনেই নেমে যাবে, আবার ফিরে যাবে কলকাতা;
আকাশ কে যে তার চাই-, - আকাশের বুকের স্পন্দনে মুখটাও এবার সুখ নিতে পারেনি,- না
না এবার আবার ফেরবার পালা।
তড়িঘড়ি ঘুমন্ত নিতু কে টেনে তোলে অনিমা, নিতু ঘুম ভাঙ্গা চোখে মাকে প্রশ্ন
করে, আনিমা বলে ওঠে “ আমরা সামনের স্টেশনে নামবো মা, বাবার কাছে যাব” সব
কিছু দ্রুত গুছিয়ে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেশনে এসে গাড়ি থামে।
কিন্তু অনিমা উঠতে পারছে না , কে যেন সিটের সাথে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে। এক
মুহূর্তে অসংখ্য ঘটনা মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করছে। পুরনো স্মৃতিগুলো সব যেন পরিষ্কার
চোখের সামনে ফুটে উঠছে।
--আঃ! কত কষ্ট সহ্য
করেছে অনিমা শুধুমাত্র আকাশের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু তার কোনও প্রতিদান আকাশ দেয়নি,
শুধু অবিশ্বাস। অফিস থেকে একটু ফিরতে দেরি হলে, কি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাত আকাশ,
রাতে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে, খোলা চুলে বিলি কাটতে কাটতে, হটাত নিষ্ঠুর হয়ে উঠত
আকাশ, চুলের মুঠি টেনে ধরে, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত অনিমার মুখের দিকে, কি
শান্ত, কিন্তু কি ভয়ঙ্কর সে দৃষ্টি। একটা কথাই বলত আকাশ --- তুমি কি হারিয়ে যাচ্ছ
অনিমা? আমি বেকার! আমার সাথে থাকতে তোমার বড় কষ্ট না!” অনিমা বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে
থাকত, এ প্রশ্নের কি ই বা উত্তর হতে পারে।
আধো আধো শব্দে নিতু
বলে ওঠে- “ মা নামবেনা, বাবার কাছে যাবেনা?”
অনিমা কিছু জবাব
দেয়না, জানলার দিকে তাকিয়ে থাকে।
দূরের আকাশ যেন কি
অব্যক্ত কথা বলতে চাইছে। পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্রে কি সুন্দর ই না লাগছে তাকে।
কিন্তু একি! কালো মেঘের আড়ালে ঢেকে গেল পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র। ভয়াবহ অন্ধকারে
ছেয়ে গেল সম্পূর্ণ আকাশ।
নিতু ডেকে ওঠে- “ মা – ও মা”-
ট্রেন আবার চলতে শুরু
করে।।
